বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে একটু ভুলে যাওয়া স্বাভাবিক বিষয়। তবে যদি দেখা যায়, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মনে থাকছে না, পরিচিত মুখ বা ঘটনার কথা বারবার ভুলে যাচ্ছেন—তাহলে সেটি অবহেলা করা ঠিক নয়। আমাদের অনেক দৈনন্দিন অভ্যাসই নিঃশব্দে মস্তিষ্কের ক্ষতি করে, বাড়ায় স্মৃতিভ্রম বা ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি। বিশেষজ্ঞদের মতে, সচেতন থাকলে এই ঝুঁকি অনেকটাই কমানো যায়।
চলুন জেনে নেওয়া যাক এমন সাতটি সাধারণ ভুল, যা আমরা প্রায়ই করে ফেলি অজান্তেই—
১. ঘুমকে অবহেলা করা
কম ঘুম মস্তিষ্কের জন্য একেবারেই ক্ষতিকর। ঘুমের সময় মস্তিষ্ক সারা দিনের তথ্য প্রক্রিয়া করে এবং অবাঞ্ছিত টক্সিন দূর করে। নিয়মিত ঘুম না হলে স্মৃতিশক্তি দুর্বল হতে থাকে। প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতিদিন গড়ে সাত থেকে আট ঘণ্টা গভীর ঘুম প্রয়োজন। রাত জেগে কাজ বা মোবাইল ব্যবহার করা অভ্যাসে পরিণত হলে তা ধীরে ধীরে স্মৃতিশক্তি ক্ষয় করতে পারে।
২. মানসিক চাপকে নিয়ন্ত্রণে না রাখা
দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাস অংশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, যা স্মৃতিশক্তি নিয়ন্ত্রণ করে। উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা বা হতাশা থেকে মুক্ত থাকতে নিয়মিত হাঁটা, মেডিটেশন, প্রিয় কাজ করা বা বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো খুবই কার্যকর। মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া মানে আসলে স্মৃতিশক্তির যত্ন নেওয়া।
৩. একঘেয়ে জীবন ও মস্তিষ্কের অলসতা
মস্তিষ্কও শরীরের মতো নিয়মিত ব্যায়াম চায়। প্রতিদিন একই কাজ করে গেলে মস্তিষ্কের চিন্তাশক্তি সংকুচিত হয়। নতুন কিছু শেখা, পড়া, পাজল বা শব্দখেলা খেলা, এমনকি নতুন রাস্তায় হাঁটা—এসবই মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখে। মস্তিষ্ক যত সক্রিয় থাকবে, স্মৃতিশক্তিও তত ভালো থাকবে।
৪. অস্বাস্থ্যকর খাবার ও শরীরচর্চার অভাব
অতিরিক্ত তৈলাক্ত ও চিনি-সমৃদ্ধ খাবার শুধু শরীর নয়, মস্তিষ্ককেও ক্ষতি করে। এসব খাবার রক্তে কোলেস্টেরল বাড়ায়, ফলে মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। অন্যদিকে শাকসবজি, ফল, মাছ ও বাদামে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড স্মৃতিশক্তি রক্ষায় সাহায্য করে। নিয়মিত হালকা শরীরচর্চা মস্তিষ্কে অক্সিজেনের সরবরাহ বাড়ায়, যা মনোযোগ ও স্মরণশক্তি বাড়াতে কার্যকর।
৫. সামাজিক যোগাযোগ থেকে দূরে থাকা
মানুষ সামাজিক প্রাণী। পরিবার, বন্ধু বা সহকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ না রাখলে মানসিক একাকিত্ব বাড়ে, যা মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা কমিয়ে দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা সামাজিকভাবে সক্রিয় থাকেন, তাদের ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে অনেক কম।
৬. অপ্রয়োজনীয় ও অতিরিক্ত ওষুধ ব্যবহারে অসাবধানতা
অনেক ওষুধ—বিশেষত ঘুম ও উদ্বেগের ওষুধ, কিছু পেইনকিলার বা অ্যান্টিহিস্টামিন—দীর্ঘমেয়াদে স্মৃতি ও মনোযোগে প্রভাব ফেলতে পারে। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া নিয়মিত ওষুধ বদলানো বা অতিরিক্ত ব্যবহারে সতর্ক থাকুন; প্রয়োজনে মেডিকেল রিভিউ করান।
৭. মাদক, অতিরিক্ত অ্যালকোহল ও ধূমপান
ধীরে-ধীরে মস্তিষ্কের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত করে—স্মৃতি ও সিদ্ধান্তগ্রহণে প্রভাব পড়ে। নিয়মিত বেশি মাত্রার মদ্যপান বা ধূমপান স্মৃতিভ্রমের ঝুঁকি বাড়ায়; প্রয়োজনে চিকিৎসা বা সমর্থন গ্রুপের সাহায্য নিন।
মস্তিষ্কের যত্ন মানে কেবল পড়াশোনা বা কাজের দক্ষতা বাড়ানো নয়, বরং নিজের সামগ্রিক সুস্থতার যত্ন নেওয়া। ঘুম, খাদ্যাভ্যাস, মানসিক শান্তি ও সামাজিক সংযোগ—এই চারটি বিষয়েই লুকিয়ে আছে দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতিশক্তির রহস্য। আজ থেকেই সচেতন হোন, কারণ মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যই জীবনের ভারসাম্য রক্ষা করে।