দুধ এমন একটি খাবার যা ছোটবেলা থেকেই শরীরের পুষ্টির প্রধান উৎস হিসেবে পরিচিত। কিন্তু অনেকের ক্ষেত্রে দেখা যায়—দুধ বা দুধজাত খাবার খাওয়ার পর পেট ব্যথা, গ্যাস, ফাঁপা ভাব, কিংবা ডায়রিয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়। অনেকেই ভাবেন, হয়তো খাবার নষ্ট ছিল বা হজমে সমস্যা হচ্ছে। কিন্তু এর মূল কারণ হতে পারে ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতা (Lactose Intolerance)।
ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতা আসলে কী?
দুধ ও দুধজাত খাবারে থাকে এক ধরনের প্রাকৃতিক চিনি, যার নাম ল্যাকটোজ। আমাদের শরীরে এই ল্যাকটোজ ভাঙার কাজ করে ল্যাকটেজ নামের একটি এনজাইম। যাদের শরীরে এই এনজাইমের পরিমাণ কম, তারা দুধ খাওয়ার পর ল্যাকটোজ হজম করতে পারেন না। ফলে ল্যাকটোজ অন্ত্রে জমে গিয়ে গ্যাস, পেট ব্যথা ও অস্বস্তি তৈরি করে।
লক্ষণগুলো কেমন হয়
দুধ বা দুগ্ধজাত খাবার খাওয়ার ৩০ মিনিট থেকে ২ ঘণ্টার মধ্যে নিচের উপসর্গগুলো দেখা দিতে পারে—
পেট ব্যথা ও ক্র্যাম্প
গ্যাস ও ফাঁপা ভাব
পাতলা পায়খানা বা ডায়রিয়া
বমি বমি ভাব
পেটে গড়গড় শব্দ
তবে এই উপসর্গের তীব্রতা সবার ক্ষেত্রে একরকম নয়। কেউ কেউ অল্প দুধ খেলেই সমস্যা অনুভব করেন, আবার কেউ অল্প পরিমাণে সহ্য করতে পারেন।
কারা বেশি আক্রান্ত হন
বিশ্বজুড়ে প্রাপ্তবয়স্কদের বড় একটি অংশেই এই সমস্যা দেখা যায়। বয়স বাড়ার সঙ্গে শরীরে ল্যাকটেজ এনজাইমের উৎপাদন কমে যায়। এশীয় ও আফ্রিকান জনগোষ্ঠীতে ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতা তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।
কীভাবে নিশ্চিত হবেন এটি ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতা কিনা
লক্ষণ দেখে অনুমান করা গেলেও সঠিকভাবে নিশ্চিত হতে চিকিৎসকের পরামর্শে কয়েকটি পরীক্ষা করা যেতে পারে—
ল্যাকটোজ টলারেন্স টেস্ট: দুধ খাওয়ার পর রক্তে শর্করার মাত্রা মাপা হয়।
হাইড্রোজেন ব্রিদ টেস্ট: নিঃশ্বাসে হাইড্রোজেনের পরিমাণ নির্ণয় করা হয়, যা হজম না হওয়া ল্যাকটোজের উপস্থিতি নির্দেশ করে।
স্টুল টেস্ট: শিশুদের ক্ষেত্রে মলের নমুনা বিশ্লেষণ করা হয়।
চিকিৎসা ও করণীয়
ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতা পুরোপুরি নিরাময়যোগ্য না হলেও জীবনযাপন ও খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমে এটি সহজেই নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
দুধ বা দুধজাত খাবার খাওয়ার পর সমস্যা হলে এগুলো সীমিত করুন বা বন্ধ রাখুন।
চাইলে ল্যাকটোজ-ফ্রি দুধ বা উদ্ভিজ্জ দুধ (যেমন বাদাম, সয়া বা ওট দুধ) খেতে পারেন।
দই বা ঘোলের মতো ফারমেন্টেড দুগ্ধজাত খাবারে ল্যাকটোজের পরিমাণ তুলনামূলক কম থাকে, তাই এগুলো কিছু ক্ষেত্রে সহনীয় হতে পারে।
চিকিৎসকের পরামর্শে ল্যাকটেজ এনজাইম ট্যাবলেট খেলে অনেক সময় দুধ হজম করা সহজ হয়।
খাদ্য থেকে ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন–ডি নিশ্চিত করার জন্য বিকল্প উৎস (যেমন মাছ, ডিম, শাকসবজি) গ্রহণ করুন।
শেষ কথা
দুধ শরীরের জন্য উপকারী হলেও সবার জন্য নয়। যদি দুধ বা দুধজাত খাবার খাওয়ার পর বারবার অস্বস্তি বা পেট ব্যথা হয়, তবে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। সময়মতো সঠিক কারণ জানা গেলে খাদ্যাভ্যাসে সামান্য পরিবর্তনেই জীবনকে রাখা সম্ভব আরামদায়ক ও সুস্থ।