নতুন পোশাক, জুতো বা ব্যাগের দোকানে গেলেই কারও কারও চোখ জ্বলজ্বল করে ওঠে। ডিসকাউন্টের বোর্ড দেখলেই যেন হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়। এমনকি প্রয়োজন না থাকলেও কেনাকাটা করার তীব্র ইচ্ছে সংবরণ করা যায় না। প্রথমে মনে হয়, ‘একটা জিনিস কিনলেই মন ভালো হয়ে যাবে।’ কিন্তু কিছুক্ষণ পরই আবার মনে হয়, ‘আরেকটা কিনলে হয়তো আরও ভালো লাগবে।’ এই চক্রই একসময় তৈরি করে শপিং অ্যাডিকশন—অর্থাৎ কেনাকাটায় আসক্তি।
শপিং অ্যাডিকশন আসলে কী
শপিং অ্যাডিকশন বা ‘কমপালসিভ বাইয়িং ডিজঅর্ডার’ হচ্ছে এক ধরনের মানসিক প্রবণতা, যেখানে ব্যক্তি বারবার অপ্রয়োজনে জিনিস কেনে, যদিও সে জানে এটি তার আর্থিক ও মানসিক ক্ষতি ডেকে আনবে। এটি মাদক বা গেমিং আসক্তির মতোই একটি মনস্তাত্ত্বিক নির্ভরশীলতা, যা মানুষকে সাময়িক আনন্দ দেয়, কিন্তু পরে নিয়ে আসে অনুশোচনা, চাপ ও অর্থনৈতিক সমস্যা।
কেন হয় কেনাকাটার এই নেশা
শপিং অ্যাডিকশনের পেছনে কাজ করে একাধিক মানসিক ও জৈবিক কারণ।
১. ডোপামিনের প্রভাব: কেনাকাটা করার সময় আমাদের মস্তিষ্ক থেকে ডোপামিন নামের এক রাসায়নিক নিঃসৃত হয়, যা আনন্দের অনুভূতি জাগায়। বারবার সেই আনন্দ পাওয়ার আশায় মানুষ আবারও কেনাকাটায় ঝোঁকে।
২. চাপ বা দুঃখ থেকে মুক্তি পেতে: কেউ কেউ কাজের চাপ, একাকীত্ব বা মানসিক অশান্তি দূর করতে কেনাকাটাকে আশ্রয় হিসেবে নেয়। সাময়িক আনন্দ মিললেও সমস্যার মূল কারণ রয়ে যায় আগের মতোই।
৩. সামাজিক প্রভাব: আজকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক জীবনে সবাই চাইছে নিজের জীবনকে ঝলমলে দেখাতে। অন্যের বিলাসী পোস্ট দেখে অনেকেই অজান্তেই তুলনামূলক মনোভাবের শিকার হয়, ফলে অপ্রয়োজনে কেনাকাটা বাড়ে।
৪. অফার ও ডিসকাউন্টের ফাঁদ: ই-কমার্স ও শপিং মলগুলো ক্রেতার মনস্তত্ত্ব বুঝে এমনভাবে অফার দেয় যে, অনেকেই ভেবে নেয়, “না কিনলে ক্ষতি!”
শপিং অ্যাডিকশনের লক্ষণগুলো
এই অভ্যাস সাধারণ কেনাকাটা নয়, তা বোঝা যায় কিছু আচরণে।
প্রতিবার কেনার পর অনুশোচনা বা অপরাধবোধ কাজ করা।
প্রয়োজন না থাকলেও কিছু না কিছু কেনার তাগিদ অনুভব করা।
টাকা না থাকলেও ক্রেডিট কার্ড বা ধার করে কেনাকাটা করা।
পরিবার বা বন্ধুদের কাছ থেকে কেনাকাটার তথ্য গোপন করা।
মন খারাপ থাকলে দোকান বা অনলাইন অ্যাপে ঢুকে পড়া।
নিজেকে সামলানোর উপায়
শপিং অ্যাডিকশন থেকে মুক্তি সম্ভব—তবে দরকার সচেতনতা ও সংযম।
১. কেনার আগে ভাবুন: নিজেকে প্রশ্ন করুন—‘এটি কি সত্যিই দরকার?’ যদি উত্তর না আসে, তবে একদিন অপেক্ষা করুন। বেশিরভাগ সময়েই ইচ্ছাটা পরদিন মিলিয়ে যায়।
২. লিস্ট তৈরি করুন: বাজারে যাওয়ার আগে কী কী প্রয়োজন, তা লিখে নিন এবং সেই তালিকাই অনুসরণ করুন।
৩. বাজেট সীমা নির্ধারণ করুন: প্রতি মাসে কেনাকাটার জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ আলাদা করে রাখুন। সীমা পেরুলে আর ব্যয় করবেন না।
৪. ক্রেডিট কার্ডে দূরত্ব রাখুন: যাদের কেনাকাটার প্রবণতা বেশি, তাদের জন্য নগদ টাকায় কেনাকাটা করা নিরাপদ। এতে সীমা বোঝা যায়।
৫. অনলাইন অ্যাপ থেকে বিরতি নিন: প্রয়োজনে কিছুদিনের জন্য অনলাইন শপিং অ্যাপ আনইনস্টল করুন বা নোটিফিকেশন বন্ধ রাখুন।
৬. অন্য আনন্দের উৎস খুঁজুন: বই পড়া, হাঁটা, গান শোনা বা প্রিয় মানুষদের সঙ্গে সময় কাটানো—এসবই আপনাকে মানসিকভাবে প্রশান্তি দিতে পারে, কেনাকাটার বিকল্প হিসেবে।
৭. প্রয়োজনে কাউন্সেলরের পরামর্শ নিন: যদি এই অভ্যাস নিজের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তবে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা কাউন্সেলরের সহায়তা নেওয়া জরুরি।
শেষ কথা
কেনাকাটা নিজেই কোনো খারাপ অভ্যাস নয়; বরং সঠিকভাবে করলে এটি আনন্দ ও আত্মতৃপ্তি এনে দেয়। কিন্তু যখন তা নিয়ন্ত্রণ হারায়, তখনই তা পরিণত হয় মানসিক ভারে ও আর্থিক ক্ষতিতে। তাই নিজেকে একটু প্রশ্ন করুন—আপনি কি জিনিস কিনছেন নিজের প্রয়োজনের জন্য, নাকি নিজের মন ভালো রাখার জন্য? উত্তরটিই বলে দেবে আপনি আনন্দে কিনছেন, না কি আসক্তিতে ডুবে যাচ্ছেন।