সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সুখী দেখানোর চাপ


ছবিতে হাসি, সুন্দর পোশাক, সাজানো ঘর, রেস্তোরাঁর টেবিলে পছন্দের খাবার, ঘুরতে যাওয়ার দৃশ্য। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুললেই যেন চারপাশে সুখের মেলা। কারও নতুন চাকরি, কারও বিদেশভ্রমণ, কারও বিয়ের আয়োজন, কারও পরিবারের সঙ্গে আনন্দের মুহূর্ত। অন্যের জীবনের এসব সুন্দর ছবি দেখতে দেখতে কখনো কখনো নিজের জীবনকেই নিস্তেজ মনে হতে পারে। মনে হতে পারে, সবাই ভালো আছে, শুধু আমার জীবনেই যেন এত অগোছালো বিষয়।

কিন্তু পর্দায় দেখা এই সুখের ছবিটি কি পুরো জীবনের ছবি?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা সাধারণত জীবনের বেছে নেওয়া মুহূর্তগুলোই প্রকাশ করি। আনন্দের দিন, ভালো খবর, সুন্দর জায়গায় বেড়াতে যাওয়া কিংবা বিশেষ কোনো অর্জন সহজেই ছবি হয়ে যায়। কিন্তু সেই ছবির বাইরে থাকা দুশ্চিন্তা, পারিবারিক টানাপোড়েন, একাকিত্ব, আর্থিক চাপ, ব্যর্থতা কিংবা মানসিক ক্লান্তির ছবি খুব কমই প্রকাশ করা হয়। ফলে একজন মানুষের বাস্তব জীবনের সঙ্গে তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উপস্থিতির মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য তৈরি হতে পারে।

এখান থেকেই শুরু হয় সুখী দেখানোর চাপ।

কেউ হয়তো অনেক দিন ধরে মন খারাপ করে আছেন। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঢুকে দেখলেন পরিচিত সবাই আনন্দে আছে। তখন নিজের জীবন নিয়েও অস্বস্তি তৈরি হতে পারে। মনে হতে পারে, আমাকেও কিছু একটা দেখাতে হবে। নতুন পোশাক পরে ছবি তুলতে হবে, কোথাও ঘুরতে যেতে হবে, ভালো থাকার প্রমাণ দিতে হবে। ধীরে ধীরে সুখ অনুভব করার চেয়ে সুখী দেখানোই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

এই চাপের একটি বড় কারণ তুলনা। অন্যের জীবনের নির্বাচিত মুহূর্তকে নিজের পুরো জীবনের সঙ্গে তুলনা করা কখনোই সমান তুলনা নয়। আপনি জানেন নিজের জীবনের প্রতিটি ব্যর্থতা, অনিশ্চয়তা ও দুশ্চিন্তার কথা। কিন্তু অন্যের ক্ষেত্রে দেখছেন কয়েকটি ছবি, কয়েকটি বাক্য কিংবা কয়েক মিনিটের ভিডিও। তবু সেই অসম্পূর্ণ তথ্যের ওপর দাঁড়িয়েই নিজের জীবনকে বিচার করতে শুরু করি।

বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি চোখে পড়তে পারে। কে কোথায় ঘুরতে গেল, কে কী কিনল, কার পোশাক কেমন, কার জন্মদিন কতটা জাঁকজমকপূর্ণ, কে নতুন চাকরি পেল, কার সম্পর্ক কতটা সুখের দেখাচ্ছে, এসব বিষয় অজান্তেই সামাজিক মর্যাদার মাপকাঠি হয়ে উঠতে পারে। তখন নিজের সামর্থ্য ও প্রয়োজনের চেয়ে অন্যের জীবনযাপন অনুকরণ করার ইচ্ছা বাড়তে থাকে।

সুখী দেখানোর আরেকটি দিক হলো নিজের অনুভূতি লুকিয়ে রাখা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবসময় হাসিমুখের ছবি দিতে দিতে কেউ কেউ এমন ধারণা তৈরি করেন যে জীবনে কষ্ট প্রকাশ করা দুর্বলতার লক্ষণ। অথচ মন খারাপ হওয়া, ব্যর্থ হওয়া, কোনো কিছু নিয়ে ভয় পাওয়া বা ক্লান্ত হয়ে পড়া মানুষের স্বাভাবিক অভিজ্ঞতা। জীবনে দুঃখ থাকবেই। সেটিকে মুছে ফেলে কেবল আনন্দের অংশটুকু দেখালে বাস্তবতা বদলে যায় না।

আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইতিবাচক থাকা নিজে কোনো সমস্যা নয়। মানুষ তার আনন্দ ভাগ করে নেবে, সাফল্যের কথা বলবে, সুন্দর মুহূর্তের ছবি প্রকাশ করবে, এটাই স্বাভাবিক। সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন একটি নির্দিষ্ট ধরনের জীবন দেখানোর জন্য মানুষ নিজের বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করতে শুরু করে। সামর্থ্যের বাইরে খরচ করে ছবি তোলা, শুধুমাত্র দেখানোর জন্য কোথাও যাওয়া কিংবা নিজের কষ্টকে অস্বীকার করে সবসময় ভালো থাকার অভিনয় করা শেষ পর্যন্ত চাপ বাড়াতে পারে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যা দেখা যায় তা পুরো সত্য নয়, আবার পুরো মিথ্যাও নয়। একজন মানুষ সত্যিই আনন্দের সময়ের ছবি প্রকাশ করতে পারেন। সেই মুহূর্তে তিনি সত্যিই সুখী ছিলেন। কিন্তু সেই একটি মুহূর্ত তার পুরো জীবনকে প্রকাশ করে না। তাই অন্যের কয়েকটি আনন্দের ছবি দেখে তার জীবনকে সম্পূর্ণ সুখী মনে করা যেমন ভুল, নিজের একটি খারাপ দিন দেখে নিজের পুরো জীবনকে ব্যর্থ মনে করাও তেমনই ভুল।

নিজের সঙ্গে এই পার্থক্যটা পরিষ্কার রাখা দরকার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম একটি প্রদর্শনীর জায়গা হতে পারে, কিন্তু জীবন কোনো প্রদর্শনী নয়। বাস্তব জীবনে এমন অনেক সুন্দর মুহূর্ত আছে, যেগুলোর কোনো ছবি তোলা হয় না। পরিবারের সঙ্গে চুপচাপ বসে থাকা, বন্ধুর সঙ্গে দীর্ঘ কথোপকথন, কাজ শেষে স্বস্তির নিঃশ্বাস, বৃষ্টির দিনে জানালার পাশে বসে থাকা কিংবা প্রিয় মানুষের একটি সাধারণ ফোনকলও আনন্দ দিতে পারে। এসব মুহূর্তের মূল্য নির্ধারণ করে কতজন দেখল বা কতটি প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেল, তা নয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রেও তাই নিজের কাছে কিছু প্রশ্ন রাখা যেতে পারে। এই ছবি কি আমি আনন্দের জন্য প্রকাশ করছি, নাকি অন্যদের দেখানোর জন্য? অন্যের ছবি দেখে আমার ভালো লাগছে, নাকি নিজের জীবনকে ছোট মনে হচ্ছে? কোনো পোস্ট করার পর আমি স্বস্তি পাচ্ছি, নাকি প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায় অস্থির হয়ে যাচ্ছি? এসব প্রশ্নের উত্তর নিজের ব্যবহার সম্পর্কে অনেক কিছু বুঝতে সাহায্য করতে পারে।

প্রয়োজনে কিছুটা বিরতিও নেওয়া যায়। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার না করা, বিরক্তিকর বা তুলনা তৈরি করে এমন বিষয় থেকে দূরে থাকা এবং বাস্তব জীবনের সম্পর্ক ও কাজকে বেশি সময় দেওয়া মানসিক স্বস্তির জন্য উপকারী হতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, নিজের জীবনের মূল্যায়ন যেন পর্দার অন্য পাশে থাকা মানুষের জীবন দিয়ে না হয়।

সুখের জন্য দর্শক প্রয়োজন নেই। ভালো থাকার জন্য প্রতিটি মুহূর্তের ছবি তুলে প্রমাণও দিতে হয় না। এমন অনেক আনন্দ আছে, যা কেবল নিজের জন্য বেঁচে থাকলেই সবচেয়ে সুন্দর থাকে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাসিমুখের ছবি থাকুক, আনন্দের গল্পও থাকুক। তবে সেই ছবির বাইরে নিজের জন্য এমন একটি জীবনও থাকুক, যেখানে মন খারাপ করার অধিকার আছে, ব্যর্থ হওয়ার সুযোগ আছে, বিশ্রাম নেওয়ার সময় আছে এবং কারও কাছে কিছু প্রমাণ না করেও শান্তিতে থাকা যায়। কারণ মানুষ সত্যিকারের সুখী কি না, সেটি শেষ পর্যন্ত পর্দার ছবিতে নয়, পর্দা বন্ধ করার পর তার নিজের জীবনের অনুভূতিতেই ধরা পড়ে।