মস্তিষ্ক আমাদের শরীরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোর একটি। চিন্তা করা, শেখা, মনে রাখা, সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে শুরু করে আবেগ নিয়ন্ত্রণ, সবকিছুর সঙ্গেই এর সরাসরি সম্পর্ক। অথচ প্রতিদিনের কিছু অভ্যাস আমরা এমনভাবে পালন করি, যেন সেগুলোর কোনো প্রভাবই নেই। বাস্তবে দীর্ঘদিনের কিছু অনিয়ম মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যকারিতায় প্রভাব ফেলতে পারে এবং বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞানীয় অবনতির ঝুঁকিও বাড়াতে পারে।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, কোনো একটি অভ্যাস থাকলেই কারও স্মৃতিশক্তি নষ্ট হয়ে যাবে বা ডিমেনশিয়া হবে, এমন নয়। মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য জেনেটিক, শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও পরিবেশগত নানা বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। তাই বিষয়গুলোকে ঝুঁকি হিসেবে দেখা উচিত, নিশ্চিত পরিণতি হিসেবে নয়।
১. নিয়মিত ঘুম কম হওয়া
রাত জাগা কিংবা নিয়মিত প্রয়োজনের তুলনায় কম ঘুমানোকে অনেকেই ব্যস্ত জীবনের স্বাভাবিক অংশ মনে করেন। কিন্তু পর্যাপ্ত ও ভালো মানের ঘুম মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যকারিতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ঘুমের ঘাটতি থাকলে মনোযোগ, শেখা, স্মৃতি ও দৈনন্দিন কাজের সক্ষমতায় প্রভাব পড়তে পারে।
প্রাপ্তবয়স্কদের সাধারণত প্রতি রাতে ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুমের পরামর্শ দেওয়া হয়। প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমানো ও ওঠার অভ্যাস, ঘুমের আগে অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার কমানো এবং নিয়মিত ঘুমের পরিবেশ তৈরি করা এ ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।
২. সারাদিন বসে থাকা
অফিসের চেয়ার, গাড়ি, সোফা আর বিছানা মিলিয়ে অনেকের দিনের বড় একটা সময় কেটে যায় প্রায় কোনো শারীরিক পরিশ্রম ছাড়াই। শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা শুধু হৃদ্যন্ত্র বা ওজনের জন্য নয়, মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ড মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী বলে গবেষণায় প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। হাঁটা, সাইকেল চালানো, সিঁড়ি ব্যবহার কিংবা নিয়মিত ব্যায়ামের মতো সহজ কাজ দিয়ে শুরু করা যায়।
৩. ধূমপানের অভ্যাস
ধূমপানকে শুধু ফুসফুসের সমস্যা হিসেবে দেখলে বিষয়টির একটি বড় অংশ বাদ পড়ে যায়। তামাক ব্যবহারের সঙ্গে মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের ঝুঁকিও জড়িত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মস্তিষ্কের জ্ঞানীয় অবনতি ও ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কমাতে ধূমপান বন্ধ করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
তাই দিনে কয়েকটি সিগারেটই হোক, অভ্যাসটিকে নিরাপদ ভাবার কারণ নেই। ধূমপান ছাড়ার চেষ্টা যত আগে শুরু করা যায়, ততই ভালো।
৪. অতিরিক্ত বা ক্ষতিকর মাত্রায় অ্যালকোহল পান
অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবন মস্তিষ্কের জন্যও ক্ষতিকর হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি অতিরিক্ত পান বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার পাশাপাশি জ্ঞানীয় স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
WHO মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য রক্ষায় ক্ষতিকর মাত্রার অ্যালকোহল ব্যবহার কমানোর পরামর্শ দিয়েছে। অর্থাৎ ‘অল্প অল্প করে’ অভ্যাস তৈরি হয়ে যাচ্ছে কি না, সেটিও খেয়াল রাখা জরুরি।
৫. অস্বাস্থ্যকর খাবারকে নিয়মিত খাদ্যাভ্যাস বানানো
প্রতিদিন অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার, অস্বাস্থ্যকর চর্বি, অতিরিক্ত লবণ বা চিনি এবং পুষ্টির ভারসাম্যহীন খাবার খাওয়ার প্রভাব শুধু শরীরে নয়, সামগ্রিক মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের ওপরও পড়তে পারে।
স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস বলতে শুধু কোনো একটি ‘সুপারফুড’ বোঝায় না। বরং বৈচিত্র্যময় ও পুষ্টিকর খাবার, পর্যাপ্ত শাকসবজি, ফল, আঁশ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সুষম খাদ্য গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে রক্তচাপ, রক্তে শর্করা ও ওজন নিয়ন্ত্রণেরও সম্পর্ক রয়েছে।
৬. দীর্ঘদিনের মানসিক চাপকে স্বাভাবিক ধরে নেওয়া
কাজের চাপ, অর্থনৈতিক দুশ্চিন্তা, পারিবারিক সমস্যা কিংবা ব্যক্তিগত উদ্বেগ জীবনের অংশ হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘদিনের মানসিক চাপকে উপেক্ষা করা ঠিক নয়। দীর্ঘস্থায়ী চাপ ঘুম, শারীরিক সক্রিয়তা ও সামাজিক যোগাযোগের মতো গুরুত্বপূর্ণ জীবনযাপনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই কাজের ফাঁকে বিশ্রাম, নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং কাছের মানুষের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ তৈরি করা জরুরি। মানসিক চাপ যদি দৈনন্দিন জীবনকে উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যাহত করে, তাহলে পেশাদার সহায়তা নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
৭. মানুষের কাছ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া
সবসময় একা থাকা বা সামাজিক যোগাযোগ কমিয়ে দেওয়া মস্তিষ্কের জন্য ভালো অভ্যাস নয়। একাকিত্ব ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার সঙ্গে জ্ঞানীয় অবনতি এবং ডিমেনশিয়ার ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। NIA-র তথ্য অনুযায়ী, সামাজিকভাবে সক্রিয় থাকা জ্ঞানীয় স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে।
তাই ব্যস্ততার মধ্যেও পরিবার, বন্ধু, প্রতিবেশী বা সহকর্মীদের সঙ্গে অর্থপূর্ণ যোগাযোগ রাখা দরকার। মুখোমুখি কথা বলা, কোনো সামাজিক কাজে যুক্ত হওয়া কিংবা নিজের পছন্দের কোনো দল বা সংগঠনের সঙ্গে সময় কাটানোও ভালো উপায় হতে পারে।
৮. সারাক্ষণ নিষ্ক্রিয়ভাবে স্ক্রিনে ডুবে থাকা
মোবাইল বা কম্পিউটার নিজে থেকেই ‘মস্তিষ্ক নষ্ট করে’ এমন সরল দাবি বৈজ্ঞানিকভাবে ঠিক নয়। তবে অতিরিক্ত নিষ্ক্রিয় স্ক্রিন-সময় যদি ঘুম, ব্যায়াম, বই পড়া, বাস্তব জীবনের যোগাযোগ বা অন্যান্য মানসিকভাবে সক্রিয় কাজের জায়গা দখল করে নেয়, তখন সমস্যা তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে ঘুমের সময়ের কাছাকাছি দীর্ঘক্ষণ ফোন ব্যবহার করার অভ্যাস ঘুমের রুটিন ব্যাহত করতে পারে। তাই স্ক্রিন ব্যবহারের সময়ের পাশাপাশি কী ধরনের কনটেন্ট দেখছি এবং সেটি অন্য স্বাস্থ্যকর কাজকে সরিয়ে দিচ্ছে কি না, সেটিও বিবেচনা করা দরকার।
৯. একসঙ্গে অনেক কাজ করার অভ্যাস
একই সময়ে ফোন দেখা, বার্তা লেখা, ই-মেইল পড়া এবং কাজ করার চেষ্টা অনেকের কাছে দক্ষতার লক্ষণ মনে হয়। বাস্তবে মনোযোগ বারবার এক কাজ থেকে অন্য কাজে সরালে কাজের মান ও মনোযোগে সমস্যা হতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ কাজের সময় একসঙ্গে অনেক কিছু করার বদলে একটি কাজে মনোযোগ দেওয়া, অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা এবং নির্দিষ্ট সময় পরপর বিরতি নেওয়া বেশি কার্যকর হতে পারে।
১০. শ্রবণশক্তির সমস্যা উপেক্ষা করা
শুনতে সমস্যা হলেও অনেক মানুষ চিকিৎসা বা শ্রবণ পরীক্ষা করাতে চান না। কিন্তু দীর্ঘদিনের অনিরাময়িত শ্রবণ সমস্যা মস্তিষ্কের জ্ঞানীয় স্বাস্থ্যের সঙ্গেও সম্পর্কিত। NIA জানিয়েছে, বয়স্কদের ক্ষেত্রে শ্রবণশক্তি কমে যাওয়ার সঙ্গে জ্ঞানীয় অবনতির বেশি ঝুঁকি দেখা যায়। শ্রবণ সমস্যা সামাজিক বিচ্ছিন্নতাও বাড়াতে পারে।
তাই কানে কম শোনা, বারবার কথা পুনরায় বলতে বলা কিংবা টেলিভিশনের শব্দ অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে রাখার মতো লক্ষণ দেখা দিলে বিষয়টি অবহেলা না করে শ্রবণ পরীক্ষা করানো উচিত।
১১. উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে না রাখা
মস্তিষ্কের সুস্থতার সঙ্গে শরীরের সামগ্রিক স্বাস্থ্য গভীরভাবে জড়িত। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং উচ্চ কোলেস্টেরলের মতো দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা নিয়ন্ত্রণে না থাকলে ভবিষ্যতে মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব পড়তে পারে।
WHO ও NIA উভয়েই রক্তচাপ, রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরলের মতো স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। তাই শুধু অসুস্থ বোধ করলেই চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার বদলে প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাও গুরুত্বপূর্ণ।
১২. মস্তিষ্ককে একেবারেই চ্যালেঞ্জ না দেওয়া
মস্তিষ্কও সক্রিয় থাকতে চায়। নতুন কিছু শেখা, পড়াশোনা করা, কোনো বাদ্যযন্ত্র শেখা, ভাষা শেখা, লেখা, ধাঁধা সমাধান কিংবা কোনো সৃজনশীল কাজে যুক্ত থাকা মানসিকভাবে সক্রিয় থাকার সুযোগ তৈরি করে।
গবেষণায় জ্ঞানীয়ভাবে উদ্দীপক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ভালো জ্ঞানীয় স্বাস্থ্যের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে কোনো একটি গেম বা ধাঁধা ডিমেনশিয়া ঠেকানোর নিশ্চয়তা দেয়, এমন দাবি করা ঠিক নয়। বরং নিয়মিত শেখা, চিন্তা করা এবং নতুন কাজে যুক্ত থাকাকে সামগ্রিক স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অংশ হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিযুক্ত।
মস্তিষ্কের যত্ন নেওয়ার জন্য রাতারাতি জীবন বদলে ফেলার প্রয়োজন নেই। প্রতিদিন একটু বেশি হাঁটা, নিয়মিত ঘুম, ধূমপান এড়িয়ে চলা, স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এবং নিজের শারীরিক সমস্যাগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখার মতো ছোট ছোট পরিবর্তনই দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
সবচেয়ে বড় কথা, মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য আলাদা কোনো বিষয় নয়। হৃদ্যন্ত্র, রক্তনালি, ঘুম, শ্রবণশক্তি, মানসিক সুস্থতা, সামাজিক জীবন এবং দৈনন্দিন অভ্যাস, সবকিছুর সঙ্গে এটি যুক্ত। WHO-এর ২০২৬ সালের হালনাগাদ নির্দেশনাতেও জীবনযাপনের বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণযোগ্য ঝুঁকি কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
.jpg)