সুখী হতে হলে কী চাই? সুন্দর একটি বাড়ি, ভালো চাকরি, ব্যাংকে মোটা অঙ্কের টাকা, দামি গাড়ি, ঘুরতে যাওয়ার সুযোগ, নাকি পছন্দের সবকিছু হাতের কাছে থাকা? আমাদের চারপাশের জীবনযাপন অনেক সময় এমন একটি ধারণা তৈরি করে যে, আরও কিছু পেলেই বুঝি জীবনটা পূর্ণ হবে। নতুন ফোন এলে ভালো লাগবে, বেতন বাড়লে স্বস্তি আসবে, নিজের বাড়ি হলে নিশ্চিন্ত হওয়া যাবে, আরেকটু টাকা জমলে হয়তো মনটা শান্ত হবে। কিন্তু একটি চাওয়া পূরণ হওয়ার পর খুব দ্রুতই আরেকটি চাওয়া সামনে এসে দাঁড়ায়।
তাহলে সুখ আসলে কোথায়?
মানুষের জীবনে প্রয়োজনীয় জিনিসের গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। অর্থের অভাব জীবনকে কঠিন করে তোলে। নিরাপদ বাসস্থান, পুষ্টিকর খাবার, চিকিৎসা, শিক্ষা, কাজের নিশ্চয়তা এবং প্রিয়জনের নিরাপত্তা মানুষের মৌলিক স্বস্তির সঙ্গে জড়িত। এসবের ঘাটতি থাকলে শুধু ইতিবাচক চিন্তা করে সুখী থাকা সহজ নয়। কিন্তু প্রয়োজন মিটে যাওয়ার পরও কেন অনেক মানুষ অস্থির থাকেন, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, সুখের সঙ্গে বস্তুগত প্রাচুর্যের সম্পর্ক যতটা ভাবা হয়, বিষয়টি তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল।
আমরা প্রায়ই প্রয়োজন আর ইচ্ছাকে এক করে ফেলি। প্রয়োজনের জন্য একটি ভালো ফোন যথেষ্ট হতে পারে, কিন্তু ইচ্ছা তখন বলে আরও আধুনিক মডেল দরকার। পরার জন্য কয়েকটি ভালো পোশাক যথেষ্ট, কিন্তু বাজারের নতুন নকশা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পুরোনোগুলো আর তেমন ভালো নেই। একটি সাধারণ ছুটির ভ্রমণ আনন্দ দিতে পারে, কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের বিলাসী ভ্রমণের ছবি দেখে নিজের আনন্দটাকেও ছোট মনে হতে পারে।
সমস্যাটা অনেক সময় জিনিসে নয়, তুলনায়। নিজের জীবনকে যখন অন্যের জীবনের সাজানো অংশের সঙ্গে তুলনা করা শুরু করি, তখন নিজের প্রাপ্তিগুলোও কম মনে হতে থাকে। একজনের নতুন গাড়ি দেখে নিজের পুরোনো গাড়ি অপ্রতুল মনে হয়। কারও বিদেশভ্রমণের ছবি দেখে নিজের কাছের কোনো সুন্দর জায়গায় কাটানো সময়কে তুচ্ছ মনে হয়। অথচ আমরা অন্যের জীবনের পুরো গল্প দেখি না, দেখি শুধু তার নির্বাচিত কিছু মুহূর্ত।
সুখের একটি বড় অংশ তাই নির্ভর করে নিজের কাছে কী আছে, তার চেয়ে নিজের যা আছে তাকে কীভাবে দেখি তার ওপর। একই ঘরে বসে দুজন মানুষ সম্পূর্ণ ভিন্ন অনুভূতি নিয়ে দিন কাটাতে পারেন। একজন ভাবতে পারেন, ঘরটি ছোট। আরেকজন ভাবতে পারেন, এই ছোট ঘরেই তার প্রিয় মানুষগুলো আছে। বাস্তবতা একই, অনুভূতি আলাদা।
এর অর্থ এই নয় যে মানুষ উচ্চাকাঙ্ক্ষী হবে না। ভালো জীবন চাওয়া, বেশি আয় করতে চাওয়া, সুন্দর বাড়ি করা, নতুন কিছু কেনা কিংবা নিজের অবস্থার উন্নতি করার চেষ্টা খুবই স্বাভাবিক। সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন এসব অর্জনকে সুখের একমাত্র শর্ত বানিয়ে ফেলা হয়। তখন জীবনটা হয়ে ওঠে একটি দীর্ঘ অপেক্ষা। এই কাজটি শেষ হলে সুখী হব, এত টাকা জমলে সুখী হব, বাড়িটি হলে সুখী হব, সন্তান প্রতিষ্ঠিত হলে সুখী হব। কিন্তু একসময় দেখা যায়, কাঙ্ক্ষিত জায়গায় পৌঁছেও মন পুরোপুরি তৃপ্ত নয়।
সুখের জন্য সবচেয়ে দামি জিনিসগুলোর অনেকগুলোরই বাজারমূল্য নেই। একজন মানুষের সঙ্গে মন খুলে কথা বলতে পারা, অসুস্থ হলে পাশে কাউকে পাওয়া, নিজের কষ্টের কথা নিরাপদে বলতে পারা, দিনের শেষে শান্তিতে ঘুমাতে পারা, নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে অনুশোচনায় না ভোগা, কোনো কাজ করে নিজের কাছে ভালো লাগা, কিংবা দীর্ঘদিন পর কোনো পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে হাসতে পারা, এসবের মূল্য টাকা দিয়ে মাপা যায় না।
সময়ও সুখের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। অনেক মানুষ অর্থ উপার্জনের জন্য এত বেশি সময় ব্যয় করেন যে সেই অর্থ দিয়ে কেনা জিনিস উপভোগ করার সময়ই আর থাকে না। পরিবারের সঙ্গে বসে খাওয়ার সময় নেই, সন্তানের গল্প শোনার সময় নেই, বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করার সময় নেই, নিজের পছন্দের কাজ করার সময় নেই। অথচ জীবনের অনেক সুন্দর স্মৃতি তৈরি হয় এই সাধারণ সময়গুলোর মধ্যেই।
শরীর ও মন ভালো রাখার বিষয়টিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত হাঁটা বা শরীরচর্চা, পরিমিত খাবার, বিশ্রাম এবং নিজের জন্য কিছুটা নিরিবিলি সময় জীবনকে অনেক বেশি স্বস্তিদায়ক করতে পারে। প্রতিদিনের ব্যস্ততার মধ্যে এসবকে বিলাসিতা মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে এগুলোই জীবনের মান ধরে রাখতে সাহায্য করে।
আরেকটি বিষয় হলো নিজের চাহিদার সীমা বোঝা। পৃথিবী প্রতিদিন আমাদের নতুন কিছু চাইতে শেখায়। বিজ্ঞাপন বলে, এটি ছাড়া জীবন অসম্পূর্ণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বলে, অন্যদের জীবন আরও সুন্দর। বাজার বলে, পুরোনোটি বদলে নতুনটি নিন। কিন্তু সব চাওয়া পূরণ করা সম্ভব নয়, প্রয়োজনও নেই। কখন থামতে হবে, সেটি বুঝতে পারা এক ধরনের স্বাধীনতা।
কৃতজ্ঞতাও সুখের অনুভূতিকে গভীর করতে পারে। এর মানে এই নয় যে জীবনের সমস্যাগুলো অস্বীকার করতে হবে। বরং সমস্যার পাশাপাশি যা ভালো আছে, সেদিকেও নজর দেওয়া। হয়তো চাকরিতে চাপ আছে, কিন্তু কাজটি করার সুযোগও আছে। হয়তো বাড়িটি ছোট, কিন্তু সেখানে আপনজনেরা আছেন। হয়তো জীবন পরিকল্পনামতো এগোয়নি, তবু কিছু সম্পর্ক, কিছু স্মৃতি এবং কিছু অর্জন আছে, যেগুলো একসময় খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সুখ আবার সবসময় আনন্দের সমান নয়। জীবনে দুঃখ থাকবে, ব্যর্থতা থাকবে, হতাশা থাকবে, প্রিয় মানুষকে হারানোর কষ্ট থাকবে। সবসময় হাসিখুশি থাকা কোনো মানুষের পক্ষেই সম্ভব নয়। বরং সুখী জীবনের অর্থ হতে পারে, কঠিন সময়ের মধ্যেও জীবনের অর্থ খুঁজে পাওয়া এবং প্রয়োজনের সময় অন্যের হাত ধরে দাঁড়াতে পারা।
শেষ পর্যন্ত সুখের জন্য কতটা জিনিস দরকার, তার কোনো নির্দিষ্ট তালিকা নেই। কারও কাছে স্বচ্ছলতা জরুরি, কারও কাছে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, কারও কাছে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ, আবার কারও কাছে শান্ত একটি জীবনই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। তবে একটি বিষয় প্রায় সবার ক্ষেত্রেই সত্য, প্রয়োজনের সীমা পেরিয়ে শুধু জিনিস বাড়াতে থাকলেই সুখ একই হারে বাড়ে না।
হয়তো সুখী থাকার জন্য জীবনে অনেক কিছু দরকার নেই। দরকার কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস, কয়েকজন আপন মানুষ, নিজের জন্য কিছু সময়, সুস্থ থাকার চেষ্টা এবং যা নেই তার হিসাবের পাশাপাশি যা আছে তার মূল্য বোঝার ক্ষমতা। জীবনকে সবসময় আরও বড় করার চেষ্টার পাশাপাশি কখনো কখনো থেমে তাকানোও দরকার। কারণ সুখ অনেক সময় সামনে পড়ে থাকা কোনো নতুন জিনিসে নয়, আমাদের হাতে ইতিমধ্যে থাকা সাধারণ কিছু মুহূর্তের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে।
