শরীরের ছোট সংকেত, বড় বিপদের আগাম বার্তা


শরীর হঠাৎ করে সব সময় বড় কোনো অসুস্থতার জানান দেয় না। অনেক সময় খুব সাধারণ কিছু পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই শরীর সতর্ক করে দেয়। একটু বেশি ক্লান্তি, বারবার মাথা ঘোরা, অকারণে ওজন কমে যাওয়া, দীর্ঘদিনের হজমের সমস্যা কিংবা শ্বাস নিতে সামান্য কষ্ট হওয়ার মতো বিষয়কে আমরা প্রায়ই কাজের চাপ, ঘুমের ঘাটতি বা বয়সের স্বাভাবিক পরিবর্তন বলে এড়িয়ে যাই। অথচ কিছু ক্ষেত্রে এসব লক্ষণ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার কারণ হতে পারে।

অবশ্য একটি উপসর্গ দেখা দিলেই বড় কোনো রোগ হয়েছে, এমন নয়। একই লক্ষণের পেছনে নানা কারণ থাকতে পারে। তাই আতঙ্কিত না হয়ে শরীরের পরিবর্তনটি কখন শুরু হয়েছে, কতদিন ধরে আছে এবং বারবার হচ্ছে কি না, সেদিকে নজর দেওয়া জরুরি।

অকারণে ওজন কমে যাওয়া

খাবার বা ব্যায়ামের অভ্যাসে পরিবর্তন না এনে কয়েক মাসে চোখে পড়ার মতো ওজন কমে গেলে বিষয়টি খেয়াল করা দরকার। অনিচ্ছাকৃত ওজন কমার পেছনে থাইরয়েডের সমস্যা, ডায়াবেটিস, দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা, মানসিক চাপ বা হজম ও পুষ্টি শোষণের সমস্যাসহ বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। Mayo Clinic-এর তথ্য অনুযায়ী, ৬ থেকে ১২ মাসে শরীরের ওজনের ৫ শতাংশের বেশি অনিচ্ছাকৃতভাবে কমে গেলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা উচিত।

সব সময় ক্লান্ত লাগা

পর্যাপ্ত ঘুমের পরও যদি দীর্ঘদিন ধরে শরীর দুর্বল লাগে, স্বাভাবিক কাজ করতে আগ্রহ বা শক্তি না থাকে, তাহলে শুধু ব্যস্ত জীবনযাপনকে দায়ী না করাই ভালো। ঘুমের সমস্যা, রক্তস্বল্পতা, থাইরয়েডের সমস্যা, সংক্রমণসহ নানা কারণে দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি হতে পারে। বিশেষ করে ক্লান্তির সঙ্গে ওজন কমা, শ্বাসকষ্ট, বুক ধড়ফড় বা অন্য কোনো নতুন উপসর্গ যুক্ত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

বারবার মাথা ঘোরা বা ভারসাম্য হারানো

হঠাৎ উঠে দাঁড়ালে সামান্য মাথা ঘোরা এক বিষয়। কিন্তু বারবার মাথা ঘোরা, হাঁটার সময় ভারসাম্য নষ্ট হওয়া বা হঠাৎ শরীরের সমন্বয় ঠিক না থাকার মতো সমস্যা অবহেলা করা ঠিক নয়। বিশেষ করে এর সঙ্গে কথা জড়িয়ে যাওয়া, চোখে দেখতে সমস্যা, মুখের এক পাশ বেঁকে যাওয়া বা শরীরের এক পাশ অবশ বা দুর্বল হয়ে গেলে সেটি স্ট্রোকের সতর্কসংকেত হতে পারে। এ ধরনের লক্ষণ দেখা দিলে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন।

বারবার শ্বাসকষ্ট হওয়া

সিঁড়ি ভাঙার পর বা কঠিন ব্যায়ামের সময় হাঁপিয়ে যাওয়া স্বাভাবিক হতে পারে। কিন্তু স্বাভাবিক কাজের মধ্যেই অকারণে শ্বাসকষ্ট হওয়া, শ্বাস নিতে কষ্ট ক্রমে বাড়তে থাকা কিংবা হঠাৎ তীব্র শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। শ্বাসকষ্টের পেছনে ফুসফুস বা হৃদ্‌যন্ত্রের বিভিন্ন সমস্যা থাকতে পারে। হঠাৎ তীব্র শ্বাসকষ্ট হলে জরুরি চিকিৎসা নেওয়া উচিত।

বুকের ব্যথা বা চাপ

বুকের ব্যথা মানেই হার্টের সমস্যা নয়। পেশির ব্যথা, গ্যাস্ট্রিকসহ বিভিন্ন কারণেও এমন হতে পারে। তবে নতুন বা অজানা বুকব্যথা, বুক চেপে ধরা বা চাপ অনুভূতির সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, ঠান্ডা ঘাম, বমি বমি ভাব, মাথা ঝিমঝিম করা কিংবা ব্যথা হাত, ঘাড়, চোয়াল বা পিঠে ছড়িয়ে পড়লে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে। হার্ট অ্যাটাকের উপসর্গ সব মানুষের ক্ষেত্রে একই রকম হয় না, কখনো উপসর্গ তুলনামূলক মৃদুও হতে পারে।

দীর্ঘদিনের পেটের সমস্যা

এক-দুই দিনের বদহজম বা কোষ্ঠকাঠিন্য নিয়ে সাধারণত আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। কিন্তু মলত্যাগের অভ্যাসে দীর্ঘস্থায়ী ও অস্বাভাবিক পরিবর্তন, বারবার ডায়রিয়া বা কোষ্ঠকাঠিন্য, পেটে স্থায়ী ব্যথা কিংবা মলে রক্ত বা কালচে রং দেখা গেলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া দরকার। এসব পরিবর্তনের পেছনে সংক্রমণ থেকে শুরু করে অন্ত্রের বিভিন্ন রোগের কারণ থাকতে পারে।

বারবার বা দীর্ঘস্থায়ী জ্বর

জ্বর শরীরের সংক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থার একটি প্রতিক্রিয়া। কিন্তু জ্বর দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে বা বারবার ফিরে এলে কারণ খুঁজে দেখা দরকার। বিশেষ করে উচ্চ জ্বরের সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, প্রচণ্ড দুর্বলতা, অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব বা অন্য গুরুতর উপসর্গ থাকলে চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।

দৃষ্টিতে হঠাৎ পরিবর্তন

হঠাৎ চোখে ঝাপসা দেখা, দৃষ্টির একটি অংশ হারিয়ে যাওয়া বা এক চোখে আচমকা দেখতে সমস্যা হওয়াকে সাধারণ চোখের ক্লান্তি ধরে নেওয়া ঠিক নয়। বিশেষ করে এর সঙ্গে মাথা ঘোরা, কথা জড়িয়ে যাওয়া বা শরীরের এক পাশ দুর্বল হওয়ার মতো লক্ষণ থাকলে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে। স্ট্রোকের অন্যতম সতর্কসংকেতের মধ্যে হঠাৎ দৃষ্টির সমস্যা রয়েছে।

মুখ বেঁকে যাওয়া বা কথা জড়িয়ে যাওয়া

হঠাৎ হাসতে গেলে মুখের এক পাশ নেমে যাওয়া, একটি হাত দুর্বল হয়ে যাওয়া কিংবা স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে বা বুঝতে সমস্যা হওয়া স্ট্রোকের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ। এমন উপসর্গ কয়েক মিনিট পর ঠিক হয়ে গেলেও বিষয়টি উপেক্ষা করা উচিত নয়। সাময়িকভাবে উপসর্গ চলে যাওয়া ‘মিনি-স্ট্রোক’ বা TIA-এর সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে এবং দ্রুত চিকিৎসা মূল্যায়ন প্রয়োজন।

অস্বাভাবিক ফোলা

বিশেষ করে একটি পা হঠাৎ ফুলে যাওয়া, এর সঙ্গে ব্যথা বা শ্বাসকষ্ট যুক্ত হওয়া হলে দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে। রক্ত জমাট বাঁধাসহ বিভিন্ন গুরুতর সমস্যার সঙ্গে এ ধরনের লক্ষণ সম্পর্কিত হতে পারে।

শরীরের সংকেত বুঝতে হবে, কিন্তু নিজে রোগ নির্ণয় করা নয়

শরীরের কোনো পরিবর্তন দেখলেই ইন্টারনেটে খুঁজে নিজে রোগের নাম ঠিক করে ফেলা ঠিক নয়। একই উপসর্গের কারণ একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম হতে পারে। বরং নতুন কোনো লক্ষণ দেখা দিলে তার সময়কাল, তীব্রতা এবং সঙ্গে অন্য কোনো পরিবর্তন হচ্ছে কি না, তা লক্ষ্য করা ভালো। প্রয়োজন হলে চিকিৎসককে এসব তথ্য জানানো রোগ নির্ণয়ে সহায়ক হতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জরুরি লক্ষণকে ‘কাল দেখব’ বলে ফেলে রাখা যাবে না। হঠাৎ তীব্র বুকব্যথা, শ্বাসকষ্ট, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া কিংবা স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে। কারণ কিছু রোগের ক্ষেত্রে চিকিৎসা শুরু করার সময়টিই ফলাফলে বড় পার্থক্য তৈরি করতে পারে।

শরীর প্রতিদিনই আমাদের নানা সংকেত দেয়। সব সংকেত বিপদের নয়, কিন্তু কোনো নতুন বা অস্বাভাবিক পরিবর্তনকে বারবার উপেক্ষা করার অভ্যাসও নিরাপদ নয়। নিজের শরীরের স্বাভাবিক অবস্থাটা জানা এবং তার বাইরে কোনো পরিবর্তন হলে সচেতন হওয়াই সুস্থ থাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাস।