অন্যের জীবনের আয়নায় নিজেকে মাপতে গিয়ে


একজন নতুন গাড়ি কিনেছেন, কারও চাকরি হয়েছে বড় প্রতিষ্ঠানে, কেউ বিদেশে ঘুরছেন, কেউ নিজের বাড়ি করেছেন, কারও সন্তান ভালো ফল করেছে। এসব খবর শুনলে আমাদের ভালো লাগার পাশাপাশি কখনো কখনো নিজের জীবন নিয়েও প্রশ্ন জাগে। মনে হয়, সবাই যেন এগিয়ে যাচ্ছে, শুধু আমি কোথায় যেন আটকে আছি। অথচ একটু গভীরভাবে ভাবলে দেখা যায়, এই অনুভূতির পেছনে অনেক সময় বাস্তব ব্যর্থতার চেয়ে অন্যের জীবনের সঙ্গে নিজের জীবনের তুলনা করার অভ্যাসই বেশি কাজ করে।

তুলনা মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা। আমরা নিজের অবস্থান বোঝার জন্য চারপাশের মানুষের দিকে তাকাই। ছোটবেলায় কে ভালো পড়ছে, কে বেশি নম্বর পেল, কে শিক্ষকের প্রশংসা পেল, এসব দিয়ে তুলনার শুরু। বড় হলে বিষয় বদলায়। তখন তুলনা হয় চাকরি, আয়, বাড়ি, গাড়ি, পোশাক, সম্পর্ক, ভ্রমণ কিংবা সামাজিক অবস্থান নিয়ে। জীবনের এক পর্যায়ে এসে মনে হতে পারে, অন্যদের সঙ্গে তাল মেলানোই বুঝি সফলতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

সমস্যা হলো, প্রত্যেক মানুষের জীবনের শুরু এক জায়গা থেকে হয় না। সবার পরিবার, শিক্ষা, অর্থনৈতিক অবস্থা, সুযোগ, দায়িত্ব, শারীরিক সক্ষমতা, সম্পর্ক এবং পরিস্থিতি এক নয়। কেউ যে জায়গায় পৌঁছেছেন, সেখানে পৌঁছাতে তার পেছনে কী ধরনের সুযোগ বা সংগ্রাম ছিল, সেটি আমরা অনেক সময় জানিই না। অথচ শুধু ফলাফল দেখে নিজের সঙ্গে তার তুলনা করি।

আরও বড় সমস্যা হলো, আমরা সাধারণত অন্যের জীবনের ভালো দিকের সঙ্গে নিজের জীবনের কঠিন দিকের তুলনা করি। কারও নতুন বাড়ি দেখে নিজের পুরোনো বাড়ির কথা মনে পড়ে। কারও পদোন্নতির খবর শুনে নিজের ক্যারিয়ারের স্থবিরতা চোখে পড়ে। কারও সুখী পরিবারের ছবি দেখে নিজের পারিবারিক সমস্যাগুলো আরও বড় মনে হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই প্রবণতাকে আরও তীব্র করেছে। সেখানে মানুষের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তগুলোই বেশি দৃশ্যমান হয়। ফলে অন্যের সাজানো কয়েকটি মুহূর্তের সঙ্গে নিজের প্রতিদিনের বাস্তব জীবনকে তুলনা করা সহজ হয়ে যায়।

এই অভ্যাস ধীরে ধীরে আত্মতৃপ্তি কমিয়ে দিতে পারে। নিজের যে অর্জনগুলো একসময় আনন্দ দিয়েছে, সেগুলোও তখন ছোট মনে হয়। ভালো চাকরি পেয়েও মনে হয় অন্যজন আরও ভালো জায়গায় আছে। নিজের বাড়ি থাকলেও মনে হয় অন্যের বাড়ি বড়। ভালো সম্পর্ক থাকলেও অন্যের সম্পর্ককে আরও সুখী মনে হয়। একটি লক্ষ্য পূরণ হওয়ার পর আনন্দ উপভোগ করার আগেই নতুন তুলনা শুরু হয়ে যায়।

তুলনার এই চক্রের কোনো শেষ নেই। পৃথিবীতে সবসময় এমন কেউ থাকবে, যার আয় বেশি, বাড়ি বড়, গাড়ি দামি, সাফল্য বেশি দৃশ্যমান অথবা জীবনযাপন আরও আকর্ষণীয়। তাই অন্যকে ছাড়িয়ে যাওয়াকে যদি সুখের শর্ত বানানো হয়, তাহলে তৃপ্তি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

তবে সব ধরনের তুলনা ক্ষতিকর নয়। কখনো অন্যের সাফল্য অনুপ্রেরণা দিতে পারে। কেউ কঠিন পরিস্থিতি অতিক্রম করে ভালো কিছু করেছেন দেখে আমরাও চেষ্টা করার সাহস পেতে পারি। সমস্যা তখনই, যখন অনুপ্রেরণা বদলে হীনম্মন্যতা তৈরি হয়। অন্যের সাফল্য দেখে যদি মনে হয়, “সেও পেরেছে, আমিও চেষ্টা করতে পারি”, তাহলে সেই তুলনা ইতিবাচক হতে পারে। কিন্তু যদি মনে হয়, “সে পেরেছে, অথচ আমি পারিনি, তাই আমি ব্যর্থ”, তখন তুলনাটি নিজের বিরুদ্ধে চলে যায়।

নিজের জীবনকে অন্যের সঙ্গে তুলনা করার বদলে নিজের গতকালের সঙ্গে আজকের তুলনা অনেক বেশি অর্থপূর্ণ হতে পারে। গত এক বছরে আমি কী শিখেছি, কোন ভুল থেকে বেরিয়ে এসেছি, কোন অভ্যাস বদলেছি, কোন সম্পর্ক ভালো করেছি, কোন দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করেছি, এসব প্রশ্ন নিজের অগ্রগতি বুঝতে সাহায্য করে। সবার সাফল্যের সময় এক নয়। কেউ দ্রুত এগিয়ে যান, কেউ ধীরে। কেউ বিশ বছর বয়সে সুযোগ পান, কেউ চল্লিশে এসে নতুন করে শুরু করেন।

জীবনের সময়সূচিও সবার জন্য এক নয়। কারও জীবনে আগে পড়াশোনা, পরে চাকরি, তারপর পরিবার এসেছে। আবার কেউ পরিবার সামলে ক্যারিয়ার গড়েছেন। কেউ বহু বছর চেষ্টা করে ব্যবসায় সফল হয়েছেন। কেউ মাঝপথে পেশা বদলেছেন। তাই অন্যের বয়স, পদ বা অর্জন দেখে নিজের জীবনের সময়সূচি নির্ধারণ করা খুব একটা যুক্তিসংগত নয়।

নিজের চাহিদা এবং অন্যের প্রত্যাশার পার্থক্য বোঝাও জরুরি। অনেক সময় আমরা এমন কিছু অর্জন করতে চাই, যা সত্যিই আমাদের প্রয়োজন নয়। শুধু চারপাশের মানুষ করছে বলেই আমরাও করতে চাই। সবাই নতুন ফোন কিনছে, তাই নিজের ফোনটিও বদলাতে হবে। সবাই বিদেশে যাচ্ছে, তাই আমাকেও যেতে হবে। পরিচিতরা বাড়ি করছে, তাই আমাকেও ঋণ করে বাড়ি করতে হবে। এভাবে অন্যের জীবন আমাদের চাহিদার তালিকা তৈরি করতে শুরু করলে নিজের সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা ধীরে ধীরে কমে যায়।

তুলনার অভ্যাস থেকে বের হওয়ার প্রথম ধাপ হতে পারে নিজের জীবনের বাস্তবতাকে স্বীকার করা। কোথায় আছি, কী আছে, কী নেই এবং কোন জায়গায় পরিবর্তন দরকার, সেগুলো নিরপেক্ষভাবে দেখা। নিজের সীমাবদ্ধতা জানা মানে নিজেকে ছোট করা নয়। বরং বাস্তব অবস্থান বুঝে এগোনোর সুযোগ তৈরি করা।

কৃতজ্ঞতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। কৃতজ্ঞ থাকা মানে উন্নতি করার ইচ্ছা ছেড়ে দেওয়া নয়। বরং যা আছে তার মূল্য বোঝার পাশাপাশি যা প্রয়োজন, তার দিকে এগিয়ে যাওয়া। জীবনে আরও ভালো কিছু চাওয়া এবং বর্তমান জীবনের ভালো দিকগুলোকে সম্মান করা, দুটো একসঙ্গে সম্ভব।

সবচেয়ে বড় কথা, অন্যের জীবনের গতি দিয়ে নিজের জীবনের মূল্য নির্ধারণ করার প্রয়োজন নেই। কেউ দ্রুত এগোচ্ছে বলে আপনি পিছিয়ে নেই। আপনার পথ আলাদা হতে পারে, আপনার দায়িত্ব আলাদা হতে পারে, আপনার লক্ষ্যও আলাদা হতে পারে। জীবনের সাফল্য শুধু কে আগে পৌঁছাল, তা দিয়ে মাপা যায় না। কোথায় পৌঁছে আপনি শান্তি পেলেন, কীভাবে পথটি পাড়ি দিলেন এবং সেই পথে নিজেকে কতটা ধরে রাখতে পারলেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যের জীবনের দিকে তাকানো বন্ধ করার দরকার নেই। তবে তাকানোর পর নিজের জীবনকে ছোট করে দেখার অভ্যাসটি বদলানো দরকার। কারণ অন্যের জীবন আমাদের দেখার জন্য একটি ছবি হতে পারে, কিন্তু নিজের জীবন আমাদের বেঁচে থাকার জন্য। সেই জীবনের সঙ্গে সবচেয়ে ন্যায্য তুলনা হলো নিজের গতকালের সঙ্গে আজকের নিজেকে মেলানো। সেখানে প্রতিযোগীও আপনি নিজেই, আর উন্নতির সবচেয়ে সত্যিকারের প্রমাণও আপনার নিজের পরিবর্তন।