নতুন জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণ শুরু হয়েছে অনলাইনে। iBAS++-এর Pay Fixation অপশনে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে নতুন বেতন নির্ধারণী বিবরণী জমা দিতে হবে। এরপর সেই তথ্য যাচাই করে হিসাবরক্ষণ অফিস চূড়ান্ত অনুমোদন দেবে। ফলে নতুন পে-স্কেলে কার কত বেতন হবে, সেটি নির্ধারণে কর্মচারীর দেওয়া তথ্য এবং অফিসের সংরক্ষিত চাকরির তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এখানে সামান্য তথ্যের অমিলও নতুন বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি করতে পারে। তবে একটি বিষয় শুরুতেই পরিষ্কার করা দরকার। পে-ফিক্সেশনে ভুল হলে বেতন স্থায়ীভাবে কমে যাবে, এমন কোনো বিধান গেজেটে নেই। বরং চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত বেতন থেকে কম বা বেশি পরিশোধ হয়ে থাকলে তা সমন্বয়ের কথা বলা হয়েছে।
তাহলে কোথায় ভুল হওয়ার ঝুঁকি বেশি?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো ৩০ জুন ২০২৬ তারিখের মূল বেতন। নতুন স্কেলে বেতন নির্ধারণের ভিত্তি হিসেবে ওই তারিখে কর্মচারী যে মূল বেতন পাচ্ছিলেন, সেটি বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। একই গ্রেডে কর্মরত হলেও দুই কর্মচারীর ৩০ জুনের মূল বেতন এক না হলে নতুন স্কেলেও তাঁদের বেতন একই হবে না। কারণ একজনের একাধিক ইনক্রিমেন্ট থাকতে পারে, অন্যজনের নাও থাকতে পারে।
তাই পুরোনো মূল বেতন ভুলভাবে এন্ট্রি হলে নতুন বেতন নির্ধারণেও তার প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে ইনক্রিমেন্টসহ মূল বেতন এবং শুধু গ্রেডের প্রারম্ভিক বেতনকে এক করে ফেললে ভুল হিসাব হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কোন বেতনস্কেলের বিপরীতে নতুন স্কেল নির্ধারিত হবে। গেজেট অনুযায়ী, ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে কোনো কর্মচারী যে মূল স্কেল, উচ্চতর গ্রেড বা অন্য কোনো স্কেল পেয়ে আসছিলেন, তার বিপরীতে জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬-এর অনুরূপ স্কেল নির্ধারণ করা হবে।
অর্থাৎ শুধু বর্তমান পদ বা গ্রেডের নাম দেখে বেতন নির্ধারণ করলেই হবে না। কর্মচারী ৩০ জুন কোন স্কেল বা উচ্চতর গ্রেডে ছিলেন, সেটিও সঠিকভাবে বিবেচনায় নিতে হবে।
পে-ফিক্সেশনের হিসাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ গেজেটেই দেওয়া হয়েছে। ধরা হয়েছে, কোনো কর্মচারীর ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে মূল বেতন ছিল ১৩ হাজার ৭৯০ টাকা এবং তাঁর পুরোনো স্কেলের প্রারম্ভিক বেতন ছিল ১২ হাজার ৫০০ টাকা। ফলে প্রারম্ভিক বেতন থেকে তাঁর মূল বেতনের পার্থক্য ১ হাজার ২৯০ টাকা। নতুন অনুরূপ স্কেলের প্রারম্ভিক বেতন ২৫ হাজার টাকা। এর সঙ্গে ১ হাজার ২৯০ টাকা যোগ করলে হয় ২৬ হাজার ২৯০ টাকা। নতুন স্কেলে ২৬ হাজার ২৯০ টাকার কোনো ধাপ না থাকায় পরবর্তী উচ্চতর ধাপ ২৬ হাজার ৩০০ টাকা নির্ধারণ হবে।
এই হিসাব থেকে বোঝা যায়, নতুন স্কেলের কোনো গ্রেডের শুরুর বেতন দেখেই নিজের নতুন বেতন ধরে নেওয়া যাবে না। আবার নিজের বর্তমান মূল বেতন থেকে সরাসরি নতুন স্কেলের কোনো অঙ্ক বসিয়েও দেওয়া যাবে না। পুরোনো স্কেলের প্রারম্ভিক ধাপ, ৩০ জুনের মূল বেতন এবং নতুন অনুরূপ স্কেলের ধাপ মিলিয়ে নির্ধারণ করতে হবে।
এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। নতুন স্কেলের কোনো নির্ধারিত ধাপের সঙ্গে হিসাবের অঙ্ক মিলে না গেলে নিজের ইচ্ছামতো কাছাকাছি কোনো ধাপ বেছে নেওয়ার সুযোগ নেই। গেজেটে দেওয়া নিয়ম অনুযায়ী, হিসাবের যোগফল নতুন স্কেলের কোনো ধাপের সঙ্গে না মিললে পরবর্তী উচ্চতর ধাপে বেতন নির্ধারণ করতে হবে।
তাই পে-ফিক্সেশন করার সময় ‘কাছাকাছি’ কোনো অঙ্ক বসিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা ঠিক হবে না।
চাকরির তথ্যের অমিলও গুরুত্বপূর্ণ। নতুন বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে সার্ভিস বহির তথ্য ব্যবহার করা হচ্ছে। নন-গেজেটেড কর্মচারীদের ক্ষেত্রে ডিডিওকে সার্ভিস বহি অনুযায়ী চাকরি ও বেতনের আগের তথ্য সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ করার বিষয়টি নিশ্চিত করে হিসাবরক্ষণ অফিসে পাঠাতে বলা হয়েছে।
অর্থাৎ সার্ভিস বহিতে যদি পুরোনো বেতন, গ্রেড বা চাকরিসংক্রান্ত তথ্য একরকম থাকে, আর অনলাইনে অন্য তথ্য দেওয়া হয়, তাহলে যাচাইয়ের সময় অমিল ধরা পড়তে পারে।
এনআইডির তথ্যও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। নন-গেজেটেড কর্মচারীদের iBAS++-এ প্রবেশের ক্ষেত্রে এনআইডি নম্বর ও জন্মতারিখ ব্যবহার করতে হবে। কারও এনআইডি না থাকলে পে-ফিক্সেশনের আগে এনআইডির জন্য নিবন্ধন করতে হবে। আবার এনআইডিতে থাকা জন্মতারিখের সঙ্গে চাকরির রেকর্ডে থাকা জন্মতারিখের পার্থক্য থাকলে পে-ফিক্সেশনের আগে এনআইডির তথ্য সংশোধনের নির্দেশনা রয়েছে।
এখানে অবশ্য জন্মতারিখের অমিলকে সরাসরি ‘বেতন কমে যাওয়ার কারণ’ বলা যাবে না। এটি মূলত পে-ফিক্সেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার আগে সংশোধনযোগ্য একটি তথ্যগত সমস্যা।
পদোন্নতি পাওয়া কর্মচারীদের ক্ষেত্রেও সতর্কতা দরকার। ১ জুলাই ২০২৬ তারিখে কেউ উচ্চতর বেতনস্কেলের পদে পদোন্নতি পেলে সরাসরি নতুন উচ্চতর পদের বেতন বসিয়ে দেওয়ার নিয়ম নেই। প্রথমে ৩০ জুনের ভিত্তিতে তাঁর আগের পদের বেতন নির্ধারণ করতে হবে। এরপর পদোন্নতিপ্রাপ্ত উচ্চতর পদের জন্য প্রযোজ্য বিধি অনুযায়ী বেতন পুনর্নির্ধারণ করতে হবে।
তাই ১ জুলাইয়ের পদোন্নতির তথ্য এবং ৩০ জুনের বেতন তথ্য গুলিয়ে ফেললে বেতন নির্ধারণে সমস্যা তৈরি হতে পারে।
প্রেষণে থাকা কর্মচারীদের ক্ষেত্রেও আলাদা নিয়ম রয়েছে। গেজেট অনুযায়ী, প্রেষণে কর্মরত না থাকলে কর্মচারী নিজ মূল দপ্তর বা প্রতিষ্ঠানে যে বেতন পাওয়ার অধিকারী হতেন, সেই ভিত্তিতে তাঁর বেতন নির্ধারণ করা হবে। ফলে প্রেষণের জায়গার বেতনকে সরাসরি নতুন পে-স্কেলের ভিত্তি হিসেবে ধরে নেওয়া সঠিক হবে না।
একইভাবে ছুটি বা সাময়িক বরখাস্তের মতো বিশেষ অবস্থায় থাকা কর্মচারীদের জন্যও আলাদা বিধান রয়েছে। ১ জুলাই ২০২৬ তারিখে সাময়িক বরখাস্ত থাকা কর্মচারীর বেতন নতুন স্কেলে নির্ধারণ করা হবে না, যতক্ষণ না তিনি পুনর্বহাল হয়ে বাস্তবে কাজে যোগ দেন। পরে পুনর্বহাল হলে প্রথমে ৩০ জুনের ভিত্তিতে পুরোনো স্কেলে বেতন নির্ধারণ করে এরপর নতুন স্কেলে বেতন নির্ধারণ করতে হবে।
নতুন পে-স্কেলের পে-ফিক্সেশনে আরেকটি নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কর্মচারী অনলাইনে তথ্য পূরণ করে ডিডিওর কাছে সাবমিট করার আগে সিস্টেমেই নতুন স্কেলে তাঁর নির্ধারণযোগ্য মূল বেতনের পরিমাণ দেখাবে। এরপর ডিডিও তথ্য যাচাই করে হিসাবরক্ষণ অফিসে পাঠাবেন। হিসাবরক্ষণ অফিসও অনলাইনে তা যাচাই করে সঠিক মনে হলে অনুমোদন করবে। অনুমোদনের পর একটি ভেরিফিকেশন নম্বর তৈরি হবে এবং নির্ধারিত বেতন ও ভেরিফিকেশন নম্বর সার্ভিস বহি বা সংশ্লিষ্ট রেকর্ডে সংরক্ষণ করা হবে।
ফলে কর্মচারীর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো সাবমিট করার আগে প্রদর্শিত বেতনটি নিজের চাকরির নথির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা। ভুল তথ্য থাকলে ডিডিওর যাচাইয়ের পর্যায়েও তা ধরা পড়তে পারে।
আর যদি ভুলক্রমে কম বা বেশি বেতন পরিশোধ হয়, সেটি স্থায়ীভাবে বহাল থাকবে না। গেজেটে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, চূড়ান্তভাবে প্রতিপাদিত বেতন নির্ধারণী বিবরণীর ভিত্তিতে বেতন পরিশোধ করা হবে এবং এই প্রক্রিয়ায় কম বা বেশি বেতন পরিশোধ হয়ে থাকলে তা সমন্বয়যোগ্য হবে।
অর্থাৎ পে-ফিক্সেশনের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো ভুল তথ্যের ভিত্তিতে ভুল বেতন নির্ধারণ হওয়া। তবে সেই ভুল ধরা পড়লে সংশোধন ও সমন্বয়ের পথও রাখা হয়েছে।
সরকারি চাকরিজীবীদের তাই নতুন পে-স্কেলে পে-ফিক্সেশন করার আগে অন্তত চারটি বিষয় মিলিয়ে দেখা জরুরি: ৩০ জুন ২০২৬ তারিখের মূল বেতন, সংশ্লিষ্ট বেতনস্কেল বা উচ্চতর গ্রেড, সার্ভিস বহিতে থাকা চাকরি ও বেতনের তথ্য এবং iBAS++-এ প্রদর্শিত নতুন নির্ধারিত বেতন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, নতুন স্কেলের গ্রেডের সর্বনিম্ন বেতনকে নিজের নতুন বেতন ধরে নেওয়া যাবে না। আবার অনলাইনে যে অঙ্ক দেখাচ্ছে, সেটিও যাচাই না করে চূড়ান্ত ধরে নেওয়া উচিত নয়। নিজের সার্ভিস রেকর্ড, ৩০ জুনের মূল বেতন এবং প্রযোজ্য স্কেল মিলিয়ে দেখেই পে-ফিক্সেশন চূড়ান্ত করা নিরাপদ।
