ত্বক ও চুল ভালো রাখতে কমবেশি সবাই কিছু না কিছু সৌন্দর্যচর্চা করেন। কেউ নিয়মিত ফেসওয়াশ ব্যবহার করেন, কেউ ঘরোয়া উপাদানে ফেসপ্যাক দেন, আবার কেউ নানা ধরনের প্রসাধনী ব্যবহার করেন। যত্নের উদ্দেশ্য ভালো হলেও ভুল পদ্ধতি বা অতিরিক্ত কিছু করার অভ্যাসে উল্টো ত্বক ও চুলের ক্ষতি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা সাধারণত ত্বকের ধরন, বয়স, পরিবেশ ও ব্যক্তিগত প্রয়োজন অনুযায়ী যত্ন নেওয়ার পরামর্শ দেন। অন্যের ব্যবহারে ভালো ফল পেয়েছেন বলে একই পদ্ধতি নিজের ত্বকেও কাজ করবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। তাই সৌন্দর্যচর্চার কিছু সাধারণ ভুল সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি।
বারবার মুখ ধোয়া
মুখ পরিষ্কার রাখা জরুরি। কিন্তু দিনে বারবার মুখ ধোয়া বা শক্তিশালী ক্লিনজার ব্যবহার করা ত্বকের স্বাভাবিক আর্দ্রতা কমিয়ে দিতে পারে। এতে ত্বক শুষ্ক, টানটান বা অস্বস্তিকর লাগতে পারে। বিশেষ করে সংবেদনশীল ত্বকে অতিরিক্ত পরিষ্কার করার অভ্যাস সমস্যা বাড়াতে পারে।
মুখ পরিষ্কারের জন্য ত্বকের ধরন অনুযায়ী মৃদু ক্লিনজার বেছে নেওয়া এবং অতিরিক্ত ঘষাঘষি না করাই ভালো।
স্ক্রাব দিয়ে অতিরিক্ত ঘষাঘষি
মুখ মসৃণ করতে অনেকে নিয়মিত স্ক্রাব ব্যবহার করেন। কিন্তু ত্বকে জোরে ঘষাঘষি করলে জ্বালা, লালচে ভাব ও শুষ্কতা তৈরি হতে পারে। ত্বকের মৃত কোষ দূর করার জন্য একের পর এক এক্সফোলিয়েটিং পণ্য ব্যবহার করাও প্রয়োজন নেই।
বিশেষ করে ব্রণ বা সংবেদনশীল ত্বক থাকলে স্ক্রাব ব্যবহারে আরও সতর্ক হওয়া দরকার।
সানস্ক্রিন শুধু রোদে বের হওয়ার সময় ব্যবহার করা
সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি ত্বকের ক্ষতি করতে পারে। তাই বাইরে যাওয়ার আগে সানস্ক্রিন ব্যবহার করা ত্বকের যত্নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শুধু সমুদ্রসৈকত বা প্রচণ্ড রোদে যাওয়ার দিন সানস্ক্রিন ব্যবহার করলেই হবে, এমন ধারণা ঠিক নয়।
বাইরে থাকার সময় অনুযায়ী সানস্ক্রিন পুনরায় লাগানোর প্রয়োজন হতে পারে। কোন SPF ও কী ধরনের সানস্ক্রিন আপনার জন্য উপযুক্ত, তা ত্বকের ধরন ও ব্যবহারের পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে।
মেকআপ না তুলে ঘুমিয়ে পড়া
দিন শেষে ক্লান্ত হয়ে মেকআপ না তুলেই ঘুমিয়ে পড়ার অভ্যাস অনেকের আছে। নিয়মিত এমন করলে ত্বকের স্বাভাবিক পরিচ্ছন্নতা ও আরামের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। তাই রাতে ঘুমানোর আগে মেকআপ ভালোভাবে পরিষ্কার করে নেওয়া উচিত।
তবে মেকআপ তোলার সময় ত্বক জোরে ঘষা উচিত নয়। প্রয়োজন হলে মৃদু ক্লিনজিং পদ্ধতি ব্যবহার করা যায়।
ব্রণ খুঁটে ফেলা
মুখে ব্রণ উঠলে সেটি চেপে বা খুঁটে ফেলার প্রবণতা অনেকেরই থাকে। এতে সাময়িকভাবে ব্রণ ছোট মনে হলেও ত্বকে প্রদাহ বাড়তে পারে এবং দাগ বা ক্ষত তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
ব্রণ বারবার হলে নিজের মতো করে নানা পণ্য ব্যবহার না করে ত্বক বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া বেশি নিরাপদ।
অন্যের প্রসাধনী নিজের ত্বকে ব্যবহার করা
বন্ধুর কোনো ক্রিম বা সিরাম ব্যবহার করে ভালো ফল হয়েছে বলে নিজের ত্বকেও একই ফল হবে, এমন নয়। ত্বকের ধরন ও সংবেদনশীলতা ব্যক্তি ভেদে আলাদা। কোনো পণ্যে থাকা উপাদান কারও জন্য উপকারী হলেও অন্য কারও ত্বকে জ্বালা বা অ্যালার্জির মতো সমস্যা তৈরি করতে পারে।
নতুন কোনো পণ্য ব্যবহারের আগে এর উপাদান সম্পর্কে জানা এবং প্রয়োজন হলে ছোট একটি অংশে পরীক্ষা করে নেওয়া ভালো।
একসঙ্গে অনেক পণ্য ব্যবহার করা
ত্বক ভালো রাখতে একসঙ্গে অনেক ধরনের সিরাম, অ্যাসিড, স্ক্রাব, মাস্ক ও ক্রিম ব্যবহার করার প্রবণতা বেড়েছে। কিন্তু বেশি পণ্য মানেই বেশি যত্ন নয়। বিশেষ করে একই সময়ে একাধিক সক্রিয় উপাদান ব্যবহার করলে ত্বকে জ্বালা বা শুষ্কতা দেখা দিতে পারে।
সহজ একটি রুটিন অনেকের জন্য বেশি কার্যকর হতে পারে। ত্বকের প্রয়োজন অনুযায়ী ধীরে ধীরে পণ্য যোগ করা এবং সমস্যা হলে ব্যবহার বন্ধ করে পরামর্শ নেওয়া ভালো।
ঘরোয়া উপাদান মানেই নিরাপদ ভাবা
লেবু, বেকিং সোডা, টুথপেস্ট বা নানা রান্নাঘরের উপাদান মুখে লাগালে ত্বক দ্রুত উজ্জ্বল হবে, এমন ধারণা প্রচলিত। কিন্তু ঘরের কোনো উপাদান প্রাকৃতিক হলেই সেটি ত্বকের জন্য নিরাপদ হবে, এমন নয়।
বিশেষ করে অ্যাসিডিক বা ক্ষারীয় উপাদান সরাসরি ত্বকে ব্যবহার করলে জ্বালা বা ত্বকের বাধা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকতে পারে। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যেকোনো ঘরোয়া টোটকা অনুসরণ করার আগে সতর্ক হওয়া জরুরি।
ময়েশ্চারাইজার বাদ দেওয়া
তৈলাক্ত ত্বক বলে ময়েশ্চারাইজার প্রয়োজন নেই, এমন ধারণাও ভুল হতে পারে। ত্বকের ধরন অনুযায়ী হালকা বা উপযুক্ত ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করা যায়। শুষ্ক ত্বকে এটি আরও গুরুত্বপূর্ণ।
ত্বক তৈলাক্ত হলে ভারী ক্রিমের বদলে হালকা, নন-কমেডোজেনিক ফর্মুলা বেছে নেওয়া যেতে পারে।
চুলের যত্নে অতিরিক্ত তাপ ব্যবহার
চুল শুকানো, স্টাইল করা বা সোজা করার জন্য নিয়মিত উচ্চ তাপ ব্যবহার করলে চুলের গঠন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বারবার হেয়ার ড্রায়ার, স্ট্রেইটনার বা কার্লিং আয়রন ব্যবহারের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত তাপ এড়িয়ে চলা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তাপ-রোধী পণ্য ব্যবহার করা ভালো।
চুল ভেজা অবস্থায় জোরে আঁচড়ানো বা তোয়ালে দিয়ে শক্ত করে ঘষাও এড়িয়ে চলা উচিত।
চুল পড়লেই নতুন নতুন পণ্য ব্যবহার করা
চুল পড়ার কারণ একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম হতে পারে। খাদ্যাভ্যাস, মানসিক চাপ, হরমোন, বংশগত কারণ, কিছু শারীরিক সমস্যা বা চুলের যত্নের ধরন এর সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তাই চুল পড়া শুরু হলেই বিজ্ঞাপনে দেখা কোনো তেল বা সিরাম ব্যবহার করা সমাধান নাও হতে পারে।
অস্বাভাবিক বা দীর্ঘস্থায়ী চুল পড়া হলে কারণ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
সৌন্দর্যচর্চার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিয়মিততা, পরিমিতি এবং নিজের ত্বক ও চুলের প্রয়োজন বোঝা। প্রতিদিন নতুন কোনো পদ্ধতি চেষ্টা করার প্রয়োজন নেই। বরং ত্বক পরিষ্কার রাখা, প্রয়োজন অনুযায়ী ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার, সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি থেকে সুরক্ষা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, এই মৌলিক বিষয়গুলো ঠিক রাখাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সৌন্দর্য মানে শুধু ত্বক উজ্জ্বল করা বা চুল চকচকে রাখা নয়। নিজের শরীরের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যকে বুঝে যত্ন নেওয়াই আসল। যত্নের নামে ত্বক ও চুলের ওপর অতিরিক্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করাই হতে পারে সৌন্দর্যচর্চার সবচেয়ে ভালো অভ্যাস।
.jpg)