অনলাইনে হাজার বন্ধু, তবু কেন আমরা একা?

আজকাল আমাদের জীবনের বড় একটি অংশ কাটে মোবাইল ফোনের পর্দায়। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক বা হোয়াটসঅ্যাপে ভিড় জমে থাকে শত শত পরিচিত নাম। লিস্টে বন্ধু সংখ্যা হয়তো কয়েক হাজার, কিন্তু দিনের শেষে একান্ত প্রয়োজনের মুহূর্তে পাশে দাঁড়ায় কয়জন? অনলাইনে আমরা যতটা ব্যস্ত, বাস্তবে ততটাই নিঃসঙ্গ হয়ে যাচ্ছি— এ এক অদ্ভুত বৈপরীত্য।

প্রকৃত বন্ধুত্ব একসময় গড়ে উঠত চায়ের দোকানে আড্ডায়, একসঙ্গে স্কুলে ফেরার পথে, বা পাড়ার মাঠে খেলতে খেলতে। সেই জায়গাগুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। এখন সম্পর্কের বড় অংশ গড়ে ওঠে লাইক, রিঅ্যাকশন আর ইমোজিতে। পর্দার ওপারে হাজারো মানুষ থাকলেও আসলে সেখান থেকে পাওয়া যায় না জীবন্ত সাড়া, আন্তরিক চোখের চাহনি বা নিঃশব্দে পাশে থাকার নিশ্চয়তা।

মানুষ সামাজিক প্রাণী। আমাদের মনের গভীরে নিরাপত্তা, সান্নিধ্য আর বোঝাপড়ার তৃষ্ণা রয়েছে। অথচ ডিজিটাল জগতে সেই চাহিদা পূর্ণ হয় না। চ্যাটবক্সে যতই কথোপকথন হোক, হাত বাড়িয়ে কারও কাঁধে ভর করা যায় না। ফ্রেন্ডলিস্ট যত বড় হয়, শূন্যতার অনুভূতিও যেন ততটাই বাড়তে থাকে।

মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, অনলাইন বন্ধুত্ব আসলে মুহূর্তের জন্য মস্তিষ্ককে উত্তেজিত করে, এক ধরনের তৃপ্তি দেয়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি প্রকৃত সম্পর্কের বিকল্প হতে পারে না। কারণ সত্যিকারের সম্পর্ক গড়ে ওঠে সময়, বিশ্বাস আর একসঙ্গে কাটানো অভিজ্ঞতার ওপর। ডিজিটাল যোগাযোগে সেই গভীরতা অনুপস্থিত। এ কারণেই আধুনিক মানুষ চারপাশে ভিড় থাকা সত্ত্বেও একাকীত্বে ভুগছে।

সমস্যার সমাধান অবশ্যই আছে। অনলাইন জগৎকে পুরোপুরি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই, বরং সেটিকে সীমিত রাখা জরুরি। প্রকৃত সম্পর্ককে সময় দিতে হবে। বন্ধুদের সঙ্গে সরাসরি দেখা করা, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো কিংবা প্রতিবেশীর খোঁজখবর নেওয়া— এসব ছোট ছোট অভ্যাসই একাকীত্ব ভাঙতে সাহায্য করে।

আজকের প্রজন্ম যতই ডিজিটাল হোক, মানুষ মানুষের স্পর্শেই পূর্ণতা পায়। হাজারো অনলাইন বন্ধু যদি বাস্তব জীবনের একটি কণ্ঠস্বর, একটি হাতের মুঠো কিংবা একটি সহমর্মী দৃষ্টিকে প্রতিস্থাপন করতে না পারে, তবে বুঝতে হবে প্রকৃত বন্ধুত্ব এখনও অফলাইনের বুকেই লুকিয়ে আছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Are you human? Please solve:Captcha