মানুষ ভুল করবেই। জীবনের ছোট-বড় প্রায় প্রতিটি সিদ্ধান্তের সঙ্গেই ভুলের সম্ভাবনা থাকে। কখনো তাড়াহুড়োয় ভুল হয়, কখনো তথ্যের অভাবে, কখনো আবেগের বশে। আবার এমনও হয়, সবকিছু জেনেও আমরা ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি। আশ্চর্যের বিষয় হলো, ভুল করার চেয়ে অনেক সময় ভুল স্বীকার করাটাই মানুষের কাছে বেশি কঠিন হয়ে ওঠে।
একজন মানুষ কোনো কাজে ভুল করেছেন। বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পরও তিনি বলতে পারেন, ‘আমি ভুল করিনি।’ বরং নিজের সিদ্ধান্তের পক্ষে নানা যুক্তি দাঁড় করাতে থাকেন। কেউ আবার দায় চাপান পরিস্থিতির ওপর, কেউ অন্যের ওপর, কেউ বলেন, ‘আমার জায়গায় থাকলে তুমিও একই কাজ করতে।’ কেন এমন হয়?
এর একটি বড় কারণ আত্মসম্মান। মানুষ নিজের সম্পর্কে একটি ভালো ধারণা ধরে রাখতে চায়। নিজেকে বুদ্ধিমান, বিচক্ষণ ও সক্ষম ভাবতে ভালো লাগে। নিজের ভুল স্বীকার করলে সেই ধারণায় আঘাত লাগতে পারে। তখন ভুলটিকে মেনে নেওয়ার বদলে মানুষ নিজের সিদ্ধান্তকে সঠিক প্রমাণ করার চেষ্টা করে। বিষয়টি সব সময় অহংকার থেকে হয় না। অনেক সময় নিজের সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা ধরে রাখার স্বাভাবিক মানসিক প্রবণতাও এর পেছনে কাজ করে।
আরেকটি কারণ হলো লজ্জা ও সমালোচনার ভয়। আমরা অনেকেই মনে করি, ভুল স্বীকার করলে অন্যরা হয়তো আমাকে দুর্বল, অযোগ্য বা বোকা ভাববে। বিশেষ করে কর্মক্ষেত্র, পরিবার কিংবা সামাজিক সম্পর্কের মতো জায়গায় নিজের অবস্থান নিয়ে মানুষের মধ্যে এক ধরনের চাপ থাকে। ফলে ‘আমি ভুল করেছি’ বলার সহজ কথাটিও তখন কঠিন হয়ে যায়।
কখনো কখনো অতীতের কোনো সিদ্ধান্তের সঙ্গে মানুষের আবেগ জড়িয়ে থাকে। অনেক সময় একটি সিদ্ধান্ত নিতে আমরা সময়, অর্থ, পরিশ্রম কিংবা মানসিক শক্তি ব্যয় করি। পরে বুঝতে পারি, সিদ্ধান্তটি ঠিক ছিল না। তখন ভুল মেনে নেওয়া মানে শুধু একটি সিদ্ধান্তের ভুল স্বীকার করা নয়, নিজের আগের পরিশ্রমকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করানো। তাই মানুষ নিজের অবস্থান ধরে রাখতেই বেশি আগ্রহী হয়ে ওঠে।
ভুল স্বীকার না করার আরেকটি পরিচিত কারণ হলো নিজের কাজকে যুক্তি দিয়ে সমর্থন করার প্রবণতা। মানুষ এমন তথ্য বা ব্যাখ্যাকে বেশি গুরুত্ব দিতে পারে, যা তার আগের বিশ্বাসকে সমর্থন করে। বিপরীত তথ্য সামনে এলেও সেটিকে উপেক্ষা করা বা গুরুত্ব কমিয়ে দেখার চেষ্টা হতে পারে। ফলে ভুল বুঝতে পারার পরও কেউ নিজের সিদ্ধান্তকে ঠিক প্রমাণ করার জন্য নতুন নতুন যুক্তি খুঁজতে থাকেন।
তবে সব ভুল স্বীকার না করার পেছনে যে শুধু মানসিক দুর্বলতা থাকে, তা নয়। অনেক ক্ষেত্রে পরিবেশও মানুষকে ভুল লুকাতে শেখায়। যে পরিবারে ভুল করলে অপমান করা হয়, যে কর্মস্থলে ভুলের জন্য অযথা শাস্তি দেওয়া হয়, কিংবা যে সম্পর্কে নিজের কথা স্বীকার করলে দীর্ঘ তর্ক শুরু হয়, সেখানে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই নিজের ভুল ঢাকার পথ খুঁজতে পারে। নিরাপদ পরিবেশের অভাব মানুষকে সত্য বলার ক্ষেত্রে আরও সতর্ক করে তোলে।
শৈশবের অভিজ্ঞতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো শিশু যদি ছোট ভুলের জন্য বারবার অপমানিত হয়, তাহলে বড় হয়ে সে ভুল স্বীকার করাকে বিপজ্জনক মনে করতে পারে। সে ভাবতে শেখে, ভুল মানেই শাস্তি বা লজ্জা। অন্যদিকে যে শিশুকে ভুল থেকে শেখার সুযোগ দেওয়া হয়, তার কাছে ভুল স্বীকার করা তুলনামূলক সহজ হতে পারে।
ভুল স্বীকার করা আসলে নিজেকে ছোট করা নয়। বরং এটি নিজের সীমাবদ্ধতা বোঝার একটি উপায়। ‘আমি ভুল করেছি’ বলতে পারা মানে নিজের কাজের দায়িত্ব নেওয়া। এর মাধ্যমে একজন মানুষ বুঝতে পারেন কোথায় সমস্যা হয়েছে এবং পরেরবার কীভাবে একই পরিস্থিতি সামলানো যায়।
তবে ভুল স্বীকার করারও একটি পরিণত পদ্ধতি আছে। শুধু ‘ভুল হয়ে গেছে’ বললেই দায়িত্ব শেষ হয় না। কী ভুল হয়েছে, কেন হয়েছে এবং সেটি সংশোধনের জন্য কী করা যায়, সেটিও ভাবতে হয়। যেমন কারও সঙ্গে অন্যায় আচরণ করলে শুধু দুঃখ প্রকাশ নয়, আচরণ পরিবর্তনের চেষ্টা করাও জরুরি। কোনো কাজে ভুল হলে শুধু অজুহাত না খুঁজে ভবিষ্যতে একই ভুল এড়ানোর ব্যবস্থা করাও দরকার।
অন্যের ভুলের ক্ষেত্রেও আমাদের আচরণ গুরুত্বপূর্ণ। কেউ ভুল স্বীকার করার পর তাকে বারবার সেই ভুল মনে করিয়ে দিলে ভবিষ্যতে সে আরও বেশি গোপন করতে চাইতে পারে। ভুলকে সমর্থন করা আর ভুল স্বীকার করার সুযোগ দেওয়া এক বিষয় নয়। একজন মানুষকে তার ভুলের দায়িত্ব নিতে বলা যায়, আবার একই সঙ্গে তাকে অপমান না করেও বিষয়টি বোঝানো যায়।
সম্পর্কের ক্ষেত্রেও ভুল স্বীকারের গুরুত্ব অনেক। দাম্পত্য জীবন, বন্ধুত্ব কিংবা পারিবারিক সম্পর্কে সব সময় কে ঠিক আর কে ভুল, সেই হিসাব করতে থাকলে দূরত্ব বাড়ে। কখনো একটি ছোট ‘আমি ভুল করেছি’ অনেক বড় ঝগড়া থামিয়ে দিতে পারে। কারণ সেখানে শুধু একটি বাক্য থাকে না, থাকে অপর পক্ষের অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়ার বার্তাও।
সবচেয়ে বড় কথা, ভুল করা মানুষের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য, কিন্তু ভুল থেকে না শেখা একটি সচেতন সিদ্ধান্ত। নিজের ভুল স্বীকার করার অভ্যাস মানুষকে আরও বাস্তববাদী করে। এতে নিজের সম্পর্কে অতিরঞ্জিত ধারণা কমে এবং শেখার সুযোগ বাড়ে। যে মানুষ নিজের ভুল দেখতে পারেন, তিনি অন্যের ভুল থেকেও সহজে শিক্ষা নিতে পারেন।
তাই ভুল স্বীকার করার মুহূর্তটিকে পরাজয় হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। বরং সেটিকে নিজের সঙ্গে সৎ হওয়ার মুহূর্ত হিসেবে দেখা যায়। মানুষ ভুল করবে, সিদ্ধান্ত বদলাবে, কখনো পিছিয়ে যাবে, আবার নতুন করে শুরু করবে। নিজের ভুলকে স্বীকার করার সাহস থাকলে সেই ভুলই একসময় অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়। আর অভিজ্ঞতা থেকেই মানুষ ধীরে ধীরে আরও পরিণত হয়ে ওঠে।
.jpg)