মুখ ধোয়া আমাদের প্রতিদিনের সবচেয়ে সাধারণ পরিচর্যার একটি। সকালে ঘুম থেকে উঠে কিংবা রাতে ঘুমানোর আগে মুখে পানি দেওয়া, ফেসওয়াশ ব্যবহার করা, তারপর তোয়ালে দিয়ে মুছে নেওয়া, কাজটি এতটাই স্বাভাবিক যে এর মধ্যে ভুল হওয়ার সম্ভাবনার কথা অনেকেই ভাবেন না। অথচ ত্বক পরিষ্কার করার এই সহজ কাজটিই ভুলভাবে করলে শুষ্কতা, জ্বালা, লালচে ভাব কিংবা ব্রণের সমস্যা বাড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মুখ পরিষ্কার করার মূল উদ্দেশ্য হলো ত্বকের ময়লা, অতিরিক্ত তেল, ঘাম ও প্রসাধনীর অবশিষ্টাংশ দূর করা, ত্বকের স্বাভাবিক সুরক্ষা স্তরকে অযথা ক্ষতিগ্রস্ত করা নয়। তাই মুখ ধোয়ার সময় কিছু সাধারণ ভুল এড়িয়ে চলাই ত্বকের জন্য ভালো।
খুব গরম পানি দিয়ে মুখ ধোয়া
গরম পানি দিয়ে মুখ ধুলে পরিষ্কার হওয়ার অনুভূতি বেশি হতে পারে। কিন্তু ত্বকের জন্য অতিরিক্ত গরম পানি ভালো নয়। বিশেষ করে শুষ্ক বা সংবেদনশীল ত্বকে এটি অস্বস্তি ও শুষ্কতা বাড়াতে পারে। মুখ ধোয়ার সময় কুসুম গরম পানি ব্যবহার করা ভালো।
বারবার মুখ ধোয়া
মুখ পরিষ্কার রাখার তাগিদে কেউ কেউ দিনে বারবার ফেসওয়াশ ব্যবহার করেন। কিন্তু অতিরিক্ত পরিষ্কার করাও ত্বকে জ্বালা সৃষ্টি করতে পারে এবং ব্রণের সমস্যা বাড়াতে পারে। সাধারণভাবে দিনে দুইবার এবং অতিরিক্ত ঘাম হলে মুখ ধোয়ার পরামর্শ দেন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞরা। তবে খুব শুষ্ক বা সংবেদনশীল ত্বকের ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী রুটিন আরও কোমল হতে পারে।
শক্ত সাবান দিয়ে মুখ ধোয়া
হাত-পা বা শরীরের জন্য ব্যবহৃত সাধারণ সাবান মুখের ত্বকের জন্য সবসময় উপযুক্ত নয়। কিছু সাবান ত্বককে অতিরিক্ত শুষ্ক করে দিতে পারে। বিশেষ করে যাদের ত্বক সংবেদনশীল বা শুষ্ক, তাদের ক্ষেত্রে মৃদু ক্লিনজার ব্যবহার করা বেশি উপযোগী।
জোরে ঘষে মুখ পরিষ্কার করা
মুখে ময়লা বা তেল বেশি মনে হলেই অনেকে আঙুল, স্ক্রাব, ব্রাশ বা স্পঞ্জ দিয়ে জোরে ঘষতে শুরু করেন। এতে ত্বক পরিষ্কার হওয়ার বদলে উল্টো জ্বালা ও অস্বস্তি তৈরি হতে পারে। ব্রণ থাকলে অতিরিক্ত ঘষাঘষি সমস্যা আরও বাড়াতে পারে। মুখ পরিষ্কার করার সময় আঙুলের ডগা দিয়ে আলতোভাবে ক্লিনজার লাগানোই ভালো।
ত্বকের ধরন না বুঝে ফেসওয়াশ বেছে নেওয়া
সব ত্বকের প্রয়োজন এক নয়। কারও ত্বক তৈলাক্ত, কারও শুষ্ক, আবার কারও ত্বক একই সঙ্গে কিছু জায়গায় তৈলাক্ত এবং কিছু জায়গায় শুষ্ক। সংবেদনশীল ত্বকের ক্ষেত্রে সুগন্ধি বা ত্বকে জ্বালা তৈরি করতে পারে এমন উপাদান থেকেও সমস্যা হতে পারে। তাই শুধু বিজ্ঞাপন বা পরিচিত কারও পরামর্শ দেখে পণ্য বেছে না নিয়ে নিজের ত্বকের ধরন ও প্রয়োজন বিবেচনা করা উচিত।
মুখ মোছার সময় তোয়ালে দিয়ে ঘষাঘষি করা
মুখ ধোয়ার পর ত্বক শুকানোর জন্য অনেকে তোয়ালে দিয়ে জোরে ঘষেন। এটি ত্বকে অপ্রয়োজনীয় ঘর্ষণ তৈরি করতে পারে। বরং পরিষ্কার ও নরম তোয়ালে দিয়ে আলতো করে চাপ দিয়ে পানি শুষে নেওয়া ভালো।
মুখ ধোয়ার পর ময়েশ্চারাইজার না দেওয়া
মুখ ধোয়ার পর ত্বক যদি শুষ্ক বা টানটান লাগে, তাহলে উপযুক্ত ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করা যেতে পারে। ত্বক সামান্য ভেজা থাকা অবস্থায় ময়েশ্চারাইজার লাগালে ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করতে পারে। তৈলাক্ত বা ব্রণপ্রবণ ত্বকের ক্ষেত্রে ‘oil-free’ বা ‘non-comedogenic’ লেখা পণ্য বেছে নেওয়া যেতে পারে।
প্রতিদিন স্ক্রাব দিয়ে মৃত কোষ পরিষ্কার করার চেষ্টা
মুখ পরিষ্কার মানেই প্রতিদিন স্ক্রাব করা নয়। অতিরিক্ত এক্সফোলিয়েশন ত্বকে লালচে ভাব, শুষ্কতা ও জ্বালা তৈরি করতে পারে। কারও ত্বকে অতিরিক্ত বা আক্রমণাত্মক এক্সফোলিয়েশনের ফলে কালচে দাগও বাড়তে পারে। তাই স্ক্রাব বা অন্য কোনো এক্সফোলিয়েটর ব্যবহার করলে ত্বকের ধরন ও পণ্যের নির্দেশনা বিবেচনা করা জরুরি।
ব্রণ থাকলে আরও জোরে মুখ ধোয়া
মুখে ব্রণ উঠলে ত্বক আরও বেশি পরিষ্কার করার চেষ্টা অনেকেরই থাকে। কিন্তু ব্রণ কমানোর জন্য ত্বককে জোরে ঘষা বা বারবার ধোয়া কার্যকর সমাধান নয়। বরং এতে ত্বকে জ্বালা তৈরি হয়ে ব্রণ আরও খারাপ হতে পারে। মৃদু ক্লিনজার দিয়ে আলতোভাবে মুখ পরিষ্কার করাই ভালো।
মেকআপ না তুলে ঘুমিয়ে পড়া
মেকআপ ব্যবহার করলে রাতে ঘুমানোর আগে তা ভালোভাবে তুলে মুখ পরিষ্কার করা জরুরি। দিনের মেকআপের সঙ্গে ঘাম, ধুলা ও অন্যান্য পদার্থও ত্বকে জমে থাকতে পারে। তাই রাতে মুখ পরিষ্কার করে ঘুমানোর অভ্যাস ত্বকের যত্নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
একই তোয়ালে দীর্ঘদিন ব্যবহার করা
মুখ মোছার তোয়ালে পরিষ্কার রাখা জরুরি। বিশেষ করে পরিবারের একাধিক সদস্যের একই তোয়ালে ব্যবহার না করাই ভালো। মুখের জন্য আলাদা, পরিষ্কার ও নরম তোয়ালে ব্যবহার করলে অপ্রয়োজনীয় ময়লা ও জীবাণুর সংস্পর্শ কমানো যায়।
ত্বকে সমস্যা হওয়ার পরও একই পণ্য ব্যবহার করা
কোনো নতুন ফেসওয়াশ বা প্রসাধনী ব্যবহারের পর মুখে বারবার জ্বালা, চুলকানি, লালচে ভাব বা র্যাশ দেখা দিলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়। কোনো নির্দিষ্ট উপাদান ত্বকে জ্বালা বা অ্যালার্জির প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। এমন সমস্যা বারবার হলে পণ্যটি বন্ধ করে প্রয়োজন হলে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
ত্বকের যত্নে আসলে অনেক পণ্যের প্রয়োজন হয় না। নিয়মিত ও কোমলভাবে মুখ পরিষ্কার করা, নিজের ত্বকের উপযোগী পণ্য ব্যবহার করা, অতিরিক্ত ঘষাঘষি এড়িয়ে চলা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করাই ভালো অভ্যাসের ভিত্তি। ত্বক যত বেশি পরিষ্কার করব, তত বেশি ভালো থাকবে, এমন ধারণা ঠিক নয়। ত্বকের স্বাভাবিক ভারসাম্য বজায় রাখাই আসল কথা।
আর যদি মুখ ধোয়ার পর নিয়মিত তীব্র জ্বালা, চুলকানি, র্যাশ, অতিরিক্ত শুষ্কতা বা ব্রণের সমস্যা দেখা দেয়, শুধু প্রসাধনী বদলানোর বদলে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
.jpg)