‘৫০ শতাংশ ছাড়’, ‘একটি কিনলে একটি ফ্রি’, ‘আজই শেষ সুযোগ’ কিংবা ‘সীমিত সময়ের অফার’—এ ধরনের বিজ্ঞাপন চোখে পড়লেই অনেকের কেনাকাটার আগ্রহ বেড়ে যায়। যে পণ্যটি হয়তো কেনার কোনো পরিকল্পনাই ছিল না, ছাড়ের কথা শুনে সেটিই প্রয়োজনীয় মনে হতে শুরু করে। অথচ সব ছাড় মানেই সাশ্রয় নয়। কখনো কখনো ছাড়ের বিজ্ঞাপনই অপ্রয়োজনীয় খরচের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
কেনাকাটার আগে তাই বিজ্ঞাপনে দেখানো ছাড়ের অঙ্কের চেয়ে নিজের প্রয়োজন এবং পণ্যের প্রকৃত দামকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
প্রথমেই ভাবুন, পণ্যটি সত্যিই প্রয়োজন কি না। কোনো পণ্য ৩০ বা ৫০ শতাংশ কম দামে পাওয়া গেলেও সেটি যদি ব্যবহার করার প্রয়োজন না থাকে, তাহলে সেই কেনাকাটায় আসলে সাশ্রয় হচ্ছে না। বরং প্রয়োজনের বাইরে খরচ হচ্ছে। বিশেষ করে পোশাক, প্রসাধনী, গৃহস্থালি পণ্য কিংবা ছোটখাটো ইলেকট্রনিকস কেনার ক্ষেত্রে এই বিষয়টি সহজেই চোখ এড়িয়ে যায়।
ছাড়ের আগে পণ্যের আগের দামটিও যাচাই করে দেখা ভালো। বিজ্ঞাপনে একটি পণ্যের ওপর বড় অঙ্কের ছাড় দেখানো হলেও সেটিই যে সব সময় সবচেয়ে ভালো দাম, তা ধরে নেওয়া ঠিক নয়। একই বা কাছাকাছি পণ্য অন্য দোকান কিংবা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে কত দামে বিক্রি হচ্ছে, তা দেখে নিলে প্রকৃত সাশ্রয়ের ধারণা পাওয়া যায়।
‘একটি কিনলে একটি ফ্রি’ ধরনের অফারেও একটু হিসাব করা দরকার। দুটি পণ্যই যদি প্রয়োজন হয়, তাহলে এমন অফার কাজে লাগতে পারে। কিন্তু দ্বিতীয় পণ্যটির প্রয়োজন না থাকলে শুধু ‘ফ্রি’ শব্দটির কারণে কেনাকাটা করা অর্থ সাশ্রয়ের বদলে অতিরিক্ত খরচ ডেকে আনতে পারে।
অনেক সময় ছাড় পেতে নির্দিষ্ট পরিমাণ কেনাকাটার শর্ত থাকে। যেমন, একটি পণ্য কিনলে ছাড় নেই, কিন্তু নির্দিষ্ট অঙ্কের বেশি কেনাকাটা করলে ছাড় পাওয়া যাবে। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনের তালিকা না করে শুধু ছাড় পাওয়ার জন্য বাড়তি পণ্য যোগ করলে শেষ পর্যন্ত মোট বিলই বেড়ে যেতে পারে। তাই ছাড়ের পরিমাণ নয়, শেষ পর্যন্ত কত টাকা খরচ হচ্ছে সেটিই হিসাব করুন।
অনলাইন কেনাকাটায় আরও কিছু বিষয় খেয়াল রাখা দরকার। পণ্যের মূল দাম, ছাড়ের পরের দাম, ডেলিভারি চার্জ, অতিরিক্ত ফি এবং রিটার্ন বা পরিবর্তনের শর্ত দেখে নেওয়া উচিত। কোনো পণ্য কম দামে পাওয়া গেলেও অতিরিক্ত চার্জ যোগ হওয়ার পর সেটি অন্য জায়গার তুলনায় বেশি দামের হতে পারে।
পণ্যের মানের বিষয়টিও বাদ দেওয়া যাবে না। ছাড় দেওয়া হচ্ছে বলে মেয়াদ, ওয়ারেন্টি, গ্যারান্টি, উপাদান, আকার, মডেল বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই না করে কেনা ঠিক নয়। বিশেষ করে প্রসাধনী, খাবার, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি কিংবা শিশুদের পণ্যের ক্ষেত্রে মান ও নিরাপত্তার তথ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
আরেকটি বিষয় হলো ‘শেষ সুযোগ’ বা ‘আজই শেষ’ ধরনের তাড়াহুড়োর বার্তা। এমন ভাষা ক্রেতাকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে উৎসাহিত করে। কিন্তু সত্যিই এখনই পণ্যটি কেনা দরকার কি না, সেই প্রশ্নটি নিজেকেই করতে হবে। কয়েক মিনিট অপেক্ষা করে প্রয়োজন, দাম ও বিকল্পগুলো যাচাই করার সুযোগ থাকলে তা নেওয়াই ভালো।
কেনাকাটার আগে একটি ছোট তালিকা তৈরি করাও বেশ কার্যকর। কী কী প্রয়োজন এবং প্রতিটির জন্য আনুমানিক কত টাকা খরচ করা হবে, তা আগে ঠিক করে নিলে আকস্মিক কেনাকাটা অনেকটাই কমানো যায়। দোকানে বা অনলাইনে নতুন কোনো অফার চোখে পড়লেও তখন সহজে বোঝা যায় সেটি তালিকার প্রয়োজনের মধ্যে পড়ে কি না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ‘ছাড়’ আর ‘সাশ্রয়’ এক জিনিস নয়। কোনো পণ্য কম দামে কিনে যদি প্রয়োজনের চেয়ে বেশি খরচ হয়, সেটিকে সাশ্রয় বলা যায় না। বরং সত্যিকারের সাশ্রয় তখনই, যখন প্রয়োজনীয় পণ্যটি উপযুক্ত দামে কেনা যায় এবং কেনাকাটার পরও বাজেটের ভারসাম্য থাকে।
তাই ছাড়ের বিজ্ঞাপন দেখলে সরাসরি কেনাকাটার সিদ্ধান্ত না নিয়ে একটু থামুন। পণ্যটি প্রয়োজন কি না, অন্য কোথাও কম দামে পাওয়া যায় কি না, অফারের শর্ত কী এবং সব মিলিয়ে আপনার কত টাকা খরচ হচ্ছে, এই কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজে নিন। কয়েক মিনিটের সচেতনতা অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় খরচ থেকে পুরো মাসের বাজেটকেই বাঁচাতে পারে।
%20(2).jpg)