সকালের শুরুটা এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা কিংবা কফি ছাড়া অনেকেরই যেন কল্পনা করা যায় না। কাজের ফাঁকে, আড্ডায়, ক্লান্তি কাটাতে কিংবা রাত জেগে পড়াশোনা বা কাজ করার সময়ও চা-কফির কাপে চুমুক চলে। পরিমিত পরিমাণে পান করলে চা ও কফি শরীরের জন্য উপকারী হতে পারে। তবে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি পান করলে ধীরে ধীরে দেখা দিতে পারে নানা শারীরিক ও মানসিক সমস্যা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চা ও কফিতে থাকা ক্যাফেইন স্নায়ুতন্ত্রকে উদ্দীপিত করে। ফলে সাময়িকভাবে সতেজতা বাড়ে, মনোযোগ ধরে রাখতে সাহায্য করে এবং ক্লান্তি কম অনুভূত হয়। কিন্তু অতিরিক্ত ক্যাফেইন শরীরের স্বাভাবিক ভারসাম্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ঘুমের সমস্যা বাড়তে পারে
অতিরিক্ত চা বা কফি পান করলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় ঘুম। বিশেষ করে বিকেল বা সন্ধ্যার পর বেশি ক্যাফেইন গ্রহণ করলে রাতে ঘুমাতে দেরি হতে পারে, ঘুম ভেঙে যেতে পারে কিংবা গভীর ঘুমের পরিমাণ কমে যেতে পারে। দীর্ঘদিন এমন চলতে থাকলে ক্লান্তি, মনোযোগের ঘাটতি এবং কর্মক্ষমতা কমে যেতে পারে।
হৃদস্পন্দন বেড়ে যেতে পারে
ক্যাফেইনের প্রভাবে অনেকের হৃদস্পন্দন স্বাভাবিকের তুলনায় দ্রুত হতে পারে। সংবেদনশীল ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বুক ধড়ফড় করা বা অস্বস্তি অনুভূত হতে পারে। যাদের আগে থেকেই হৃদরোগ বা উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ক্যাফেইন গ্রহণ করা উচিত।
উদ্বেগ ও অস্থিরতা বাড়তে পারে
অতিরিক্ত ক্যাফেইন স্নায়ুকে অতিরিক্ত উদ্দীপিত করে। ফলে অস্থিরতা, উদ্বেগ, হাত কাঁপা, বিরক্তি কিংবা অকারণে দুশ্চিন্তা বাড়তে পারে। যারা উদ্বেগজনিত সমস্যায় ভুগছেন, তাদের ক্ষেত্রে এই প্রভাব আরও বেশি হতে পারে।
পাকস্থলীতে অস্বস্তি হতে পারে
খালি পেটে বারবার চা বা কফি পান করলে অনেকের গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা বাড়তে পারে। এছাড়া অম্লতা, বুকজ্বালা কিংবা পেটে অস্বস্তিও দেখা দিতে পারে। যাদের আগে থেকেই হজমের সমস্যা রয়েছে, তাদের সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
নির্ভরশীলতা তৈরি হতে পারে
প্রতিদিন অনেক বেশি ক্যাফেইন গ্রহণ করলে শরীর ধীরে ধীরে এর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারে। হঠাৎ চা বা কফি বন্ধ করলে মাথাব্যথা, ক্লান্তি, মন খারাপ, মনোযোগ কমে যাওয়া বা বিরক্তির মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। যদিও এগুলো সাধারণত কয়েক দিনের মধ্যে কমে যায়।
গর্ভাবস্থায় বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন
গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ না করার পরামর্শ দেওয়া হয়। কারণ বেশি ক্যাফেইন গর্ভের শিশুর ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। এ সময় চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ক্যাফেইন গ্রহণের পরিমাণ নির্ধারণ করা উচিত।
কতটা ক্যাফেইন নিরাপদ?
সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য দিনে প্রায় ৪০০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত ক্যাফেইন সাধারণভাবে নিরাপদ বলে ধরা হয়। এটি প্রায় চার কাপ সাধারণ কফির সমান হতে পারে। তবে পানীয়ের ধরন, তৈরির পদ্ধতি এবং কাপের আকার অনুযায়ী ক্যাফেইনের পরিমাণ ভিন্ন হয়। অন্যদিকে শিশু, কিশোর, গর্ভবতী নারী এবং কিছু নির্দিষ্ট রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য নিরাপদ মাত্রা আলাদা হতে পারে।
স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তুলুন
চা বা কফি পুরোপুরি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং পরিমিত পরিমাণে পান করাই সবচেয়ে ভালো। সন্ধ্যার পর অতিরিক্ত ক্যাফেইন এড়িয়ে চলুন, খালি পেটে বারবার চা বা কফি পান করবেন না এবং পর্যাপ্ত পানি পান করুন। যদি নিয়মিত চা বা কফি পান করার পরও ঘুমের সমস্যা, বুক ধড়ফড়, উদ্বেগ বা হজমের সমস্যা দেখা দেয়, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
এক কাপ চা বা কফি কর্মব্যস্ত দিনে স্বস্তি এনে দিতে পারে। তবে সেই স্বস্তি যেন অজান্তেই শরীরের জন্য বোঝা হয়ে না দাঁড়ায়, সেদিকে খেয়াল রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ।