অনেক দিন পর পছন্দের একটি সিনেমা দেখতে বসেছেন। শুরুতে বেশ মনোযোগ দিয়েই দেখছেন। গল্প জমে উঠেছে, চরিত্রগুলোও আকর্ষণ করছে। কিন্তু কিছুক্ষণ পর হঠাৎ হাত চলে গেল মোবাইলের দিকে। একবার বার্তা দেখলেন, তারপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঢুঁ মারলেন। সেখান থেকে একটি ভিডিও, একটি খবর, কয়েকটি মন্তব্য। চোখের সামনে সিনেমা চলতে থাকলেও মন যেন আটকে গেল ছোট পর্দায়। কিছুক্ষণ পর আবার সিনেমায় মন ফেরানোর চেষ্টা। এভাবে পুরো সিনেমাজুড়েই মোবাইল হাতে নেওয়া যেন অনেকের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হতে পারে দ্রুত পরিবর্তনশীল তথ্য ও বিনোদনের অভ্যাস। মোবাইলে আমরা একের পর এক নতুন ছবি, ভিডিও, বার্তা ও খবর পাই। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই নতুন কিছু সামনে আসে। ফলে মস্তিষ্ক দ্রুত বদলে যাওয়া উদ্দীপনায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। সিনেমার গল্প যতই ভালো হোক, সেখানে একটি দৃশ্য বা সংলাপ শেষ হওয়ার পর পরের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা আসতে কিছুটা সময় লাগে। সেই অপেক্ষার মুহূর্তেই মোবাইলের কথা মনে পড়ে যেতে পারে।
আরেকটি কারণ হলো অভ্যাস। অনেকেই কোনো নির্দিষ্ট প্রয়োজন ছাড়াই বারবার মোবাইলের পর্দা দেখেন। হাতে মোবাইল না থাকলেও মনে হয় কিছু একটা দেখা দরকার। ফলে সিনেমা দেখার মতো একটি মনোযোগের কাজের মধ্যেও পুরোনো অভ্যাসটি ফিরে আসে। কখনো মোবাইল হাতে নেওয়ার পর নিজের কাছেই মনে হয়, ‘একটু দেখি।’ কিন্তু সেই একটু দেখাই কয়েক মিনিটে গড়াতে পারে।
নোটিফিকেশনও মনোযোগ নষ্ট করার বড় কারণ। একটি বার্তার শব্দ, পর্দায় ভেসে ওঠা কোনো সতর্কতা কিংবা ফোনে হালকা কম্পনই যথেষ্ট। মনে হতে পারে, গুরুত্বপূর্ণ কিছু এসেছে। সঙ্গে সঙ্গে মোবাইল হাতে নিয়ে দেখা হয়। পরে দেখা গেল, সেটি তেমন জরুরি কিছুই নয়। তবু একবার মনোযোগ সরে গেলে সিনেমার গল্পে ফিরে আসতে সময় লাগে।
অনেক সময় সিনেমা দেখার ধরনও এর জন্য দায়ী। ঘরে বসে সিনেমা দেখলে পাশে মোবাইল থাকাটাই স্বাভাবিক। হাতে না থাকলেও টেবিলের ওপর রাখা থাকে। ফলে চোখে পড়লেই সেটি নেওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। অন্যদিকে সিনেমা হলে সাধারণত পরিবেশ মানুষকে পর্দার দিকে মনোযোগী থাকতে সাহায্য করে। চারপাশের অন্ধকার, বড় পর্দা এবং অন্য দর্শকদের উপস্থিতি মোবাইল ব্যবহারের সুযোগ ও আগ্রহ দুটোই কমিয়ে দেয়।
তবে সব সময় বিষয়টি শুধু মোবাইলের প্রতি আসক্তির কারণে হয় না। সিনেমাটি যদি খুব একটা ভালো না লাগে, গল্প ধীরগতির হয় বা দর্শকের প্রত্যাশার সঙ্গে না মেলে, তখনও মোবাইলের দিকে মন চলে যেতে পারে। অর্থাৎ বিরক্তি বা মনোযোগের ঘাটতিও এর একটি কারণ হতে পারে।
এখানে আরও একটি বিষয় কাজ করে, সেটি হলো একসঙ্গে একাধিক কাজ করার প্রবণতা। আমরা অনেক সময় ভাবি, সিনেমা দেখার পাশাপাশি বার্তা দেখা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটু ঘোরাঘুরি করলে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু মানুষের মনোযোগ আসলে এক মুহূর্তে একাধিক কাজে সমানভাবে ধরে রাখা সহজ নয়। বারবার এক কাজ থেকে অন্য কাজে মন সরালে কোনো কাজেই পুরোপুরি মনোযোগ দেওয়া হয় না।
এই অভ্যাস কমাতে খুব কঠিন কিছু করার দরকার নেই। সিনেমা শুরু করার আগে মোবাইল নীরব করে দূরে রাখা যেতে পারে। জরুরি কলের প্রয়োজন না থাকলে কিছু সময়ের জন্য ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ রাখাও কাজে দিতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সিনেমা দেখার সময় নিজেকে বোঝানো যে এই দুই ঘণ্টা অন্য কিছু না দেখেও থাকা সম্ভব। শুরুতে অস্বস্তি হতে পারে, কিন্তু অভ্যাস বদলালে একসময় সেটিই স্বাভাবিক মনে হবে।
একটি সিনেমা আসলে শুধু পর্দায় চলা কিছু দৃশ্য নয়। গল্পের সঙ্গে ধীরে ধীরে যুক্ত হওয়া, চরিত্রের অনুভূতি বোঝা এবং একটি দৃশ্যের পর আরেকটি দৃশ্যের অপেক্ষা করাও সিনেমা দেখার আনন্দের অংশ। তাই পরেরবার পছন্দের কোনো সিনেমা দেখতে বসলে মোবাইলটি একটু দূরে রাখার চেষ্টা করা যেতে পারে। হয়তো তখন বুঝতে পারবেন, এত দিন সিনেমাটি দেখছিলেন ঠিকই, কিন্তু পুরোপুরি দেখছিলেন না।
.jpg)