কোথায় যাচ্ছে টাকা?


মাসের শুরুতে মনে হয়, এবার বুঝি খরচের লাগামটা শক্ত হাতে ধরা যাবে। কিন্তু মাস শেষ হতে না হতেই দেখা যায়, প্রয়োজনীয় খরচের পাশাপাশি এমন অনেক জায়গাতেও টাকা গেছে, যেগুলো না করলেও চলত। এক-দুইবারের ছোটখাটো খরচ চোখে পড়ে না। কিন্তু মাসের পর মাস একই ধরনের খরচ চলতে থাকলে সেটিই বড় অঙ্কে পরিণত হয়।

অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানোর প্রথম ধাপ তাই খরচ বন্ধ করা নয়, বরং কোন খরচ সত্যিই প্রয়োজন আর কোনটি অভ্যাস, তাড়না বা সুবিধার কারণে হচ্ছে, সেটি চেনা।

গত এক মাসের খরচ লিখে দেখুন

মনে মনে হিসাব করলে অনেক খরচ বাদ পড়ে যায়। তাই গত এক মাসের ব্যাংক লেনদেন, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, কার্ডের বিল এবং নগদ খরচ যতটা সম্ভব এক জায়গায় লিখে ফেলুন। এরপর খাবার, যাতায়াত, কেনাকাটা, বিনোদন, বিল ও অন্যান্য খাতে ভাগ করুন।

তালিকা তৈরি করার পর অনেক সময় এমন খরচও চোখে পড়ে, যেগুলো করার সময় তেমন গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়নি।

প্রতিটি খরচকে তিন ভাগে দেখুন

কোনো খরচ দেখলেই ‘প্রয়োজন’ বা ‘অপ্রয়োজন’ বলে ফেলার বদলে তিনটি প্রশ্ন করতে পারেন। এটি কি এখনই দরকার? এটি কি আমার নিয়মিত প্রয়োজনের অংশ? নাকি শুধু ভালো লাগছে বলে কিনছি বা করছি?

যেমন, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, প্রয়োজনীয় খাবার বা কর্মস্থলে যাতায়াত সাধারণত প্রয়োজনীয় খরচ। অন্যদিকে একই ধরনের জিনিস ঘরে থাকা সত্ত্বেও নতুন কিছু কেনা, শুধু অফার দেখে কেনাকাটা করা বা ব্যবহার না করা কোনো সেবার জন্য নিয়মিত টাকা দেওয়া অপ্রয়োজনীয় খরচের ইঙ্গিত হতে পারে।

ছোট খরচকে অবহেলা করবেন না

‘মাত্র ১০০ টাকা’ বা ‘মাত্র ২০০ টাকা’ বলে অনেক খরচকে আমরা হিসাবের বাইরে রাখি। অথচ প্রতিদিনের এমন ছোট খরচ মাস শেষে উল্লেখযোগ্য অঙ্কে দাঁড়াতে পারে।

এক কাপ অতিরিক্ত কফি, অপ্রয়োজনীয় অনলাইন অর্ডার, বারবার রাইড নেওয়া কিংবা দোকান থেকে প্রয়োজনের বাইরে ছোটখাটো জিনিস কেনার অভ্যাসগুলো আলাদা করে দেখুন। একটি খরচ বড় কি না, তার চেয়ে সেটি কতবার হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

অফার দেখে কেনা মানেই সাশ্রয় নয়

ছাড়ের পণ্য কিনে টাকা বাঁচানোর ধারণাটি সব সময় ঠিক নয়। কোনো জিনিসের প্রয়োজনই না থাকলে ২০ বা ৩০ শতাংশ ছাড়েও সেটি কেনা আসলে খরচ।

কেনার আগে নিজেকে জিজ্ঞেস করুন, ‘ছাড় না থাকলেও কি আমি এটি কিনতাম?’ উত্তর যদি না হয়, তাহলে কেনাকাটাটি প্রয়োজনের চেয়ে অফারের প্রভাবে হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

ব্যবহার না করা সেবার হিসাব করুন

স্ট্রিমিং, অ্যাপ, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, জিম, সফটওয়্যার কিংবা অন্য কোনো নিয়মিত সাবস্ক্রিপশনের জন্য টাকা কাটা হচ্ছে কি না, একবার দেখে নিন। কোনটি নিয়মিত ব্যবহার করছেন আর কোনটি শুধু চালু রেখেছেন, তা আলাদা করুন।

যে সেবা দীর্ঘদিন ব্যবহার করা হচ্ছে না, সেটি বন্ধ করা যেতে পারে। তবে বাতিলের আগে কোনো চুক্তি, মেয়াদ বা অতিরিক্ত চার্জের শর্ত থাকলে তা দেখে নেওয়া ভালো।

ক্ষুধা ও আবেগের কেনাকাটা আলাদা করুন

ক্ষুধার সময় খাবার অর্ডার করা, মন খারাপ হলে কেনাকাটা করা কিংবা কোনো বিজ্ঞাপন দেখে হঠাৎ কিছু কিনে ফেলা, এসব সিদ্ধান্ত অনেক সময় পরিকল্পিত হয় না।

বিশেষ করে অনলাইন কেনাকাটার ক্ষেত্রে পণ্যটি কার্টে রেখে কিছু সময় অপেক্ষা করা যেতে পারে। কয়েক ঘণ্টা বা এক দিন পরও যদি মনে হয় জিনিসটি সত্যিই দরকার, তখন কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়।

বাজেটের সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন

শুধু মোট কত টাকা খরচ হয়েছে তা জানলেই হবে না। আয় ও প্রয়োজনীয় খরচ বাদ দেওয়ার পর কত টাকা হাতে থাকে, সেটিও দেখতে হবে। এরপর অপ্রয়োজনীয় খাতে কতটা চলে যাচ্ছে তা বোঝা সহজ হয়।

কোনো একটি খাতে বারবার বাজেট ছাড়িয়ে গেলে শুধু সেই মাসের খরচ কমানোর চেষ্টা না করে কেন বারবার এমন হচ্ছে, সেটি খুঁজে বের করুন।

‘কতটা ব্যবহার করেছি’ প্রশ্নটি করুন

কোনো পণ্য বা সেবা কেনার পর সেটি কতটা ব্যবহার করছেন, সেটি অপ্রয়োজনীয় খরচ চেনার ভালো উপায়। অনেক পোশাক কেনা হয়, কিন্তু নিয়মিত পরা হয় না। রান্নাঘরের অনেক সরঞ্জাম কেনা হয়, কিন্তু কয়েক মাস পর আর ব্যবহার করা হয় না।

কোনো জিনিস কেনার আগে তাই দাম ও পছন্দের পাশাপাশি ব্যবহার কতটা হবে, সেটিও বিবেচনা করুন।

অপ্রয়োজনীয় খরচ চেনার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো নিজের খরচের দিকে একটু দূর থেকে তাকানো। কোন খরচ প্রয়োজন, কোনটি সুবিধা এবং কোনটি কেবল অভ্যাস, সেটি আলাদা করতে পারলেই অনেকটা পরিষ্কার ছবি পাওয়া যায়।

খরচ কমানোর অর্থ সব আনন্দ বন্ধ করে দেওয়া নয়। বরং যে জায়গায় টাকা খরচ করলে সত্যিই প্রয়োজন মেটে বা জীবনে মূল্য যোগ হয়, সেখানে খরচ করা এবং বাকিটা নিয়ে সচেতন হওয়াই বেশি বাস্তবসম্মত। মাস শেষে শুধু ‘টাকা কোথায় গেল’ ভাবার বদলে প্রতিটি বড় ও ছোট খরচের উদ্দেশ্য বোঝার অভ্যাস তৈরি করতে পারলে সঞ্চয়ের পথটাও ধীরে ধীরে সহজ হয়ে আসে।