বালিশ ছাড়া ঘুমানো কি সত্যিই ভালো?


ঘুমানোর সময় মাথার নিচে বালিশ থাকবে কি থাকবে না, এ নিয়ে অনেকের মধ্যেই দ্বিধা আছে। কেউ মনে করেন বালিশ ছাড়া ঘুমালে ঘাড় ও মেরুদণ্ড স্বাভাবিক অবস্থায় থাকে। আবার কেউ মনে করেন, বালিশ ছাড়া ঘুমালে সকালে ঘাড়ে ব্যথা বা শরীরে অস্বস্তি দেখা দিতে পারে। আসলে এর কোনো একক উত্তর নেই। আপনি কীভাবে ঘুমান, আপনার গদি কেমন এবং ঘুমের সময় মাথা ও ঘাড় কীভাবে অবস্থান করছে, তার ওপর বিষয়টি অনেকটাই নির্ভর করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘুমের সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মাথা, ঘাড় ও মেরুদণ্ড যেন স্বাভাবিক ও আরামদায়ক অবস্থানে থাকে। সঠিক বালিশের কাজ হলো মাথাকে এমনভাবে সমর্থন দেওয়া, যাতে ঘাড় শরীরের সঙ্গে অস্বাভাবিকভাবে বাঁকা না হয়ে যায়।

যারা চিৎ হয়ে ঘুমান

চিৎ হয়ে ঘুমানোর ক্ষেত্রে সাধারণত বালিশ পুরোপুরি বাদ দেওয়া সবার জন্য উপযোগী নয়। মাথার নিচে কোনো সমর্থন না থাকলে ঘাড় নিচের দিকে ঝুঁকে যেতে পারে। এতে দীর্ঘ সময় ঘুমানোর পর ঘাড়ে চাপ, শক্তভাব বা ব্যথা দেখা দিতে পারে। এ ধরনের ঘুমের ভঙ্গিতে খুব উঁচু নয়, এমন একটি বালিশ ব্যবহার করা অনেকের জন্য বেশি আরামদায়ক হতে পারে।

পিঠের নিচের অংশে চাপ কমাতে হাঁটুর নিচে একটি বালিশ রাখার পরামর্শও দেওয়া হয়। এতে মেরুদণ্ডের স্বাভাবিক বাঁক বজায় রাখতে সহায়তা করতে পারে।

যারা কাত হয়ে ঘুমান

কাত হয়ে ঘুমানোর সময় মাথা ও গদির মাঝখানে তুলনামূলক বেশি জায়গা তৈরি হয়। তাই এ অবস্থায় সাধারণত বালিশের প্রয়োজন বেশি। বালিশ খুব পাতলা হলে মাথা নিচের দিকে নেমে যেতে পারে, আবার খুব উঁচু হলে ঘাড় বিপরীত দিকে বেঁকে যেতে পারে। লক্ষ্য হওয়া উচিত, মাথা ও ঘাড় যেন মেরুদণ্ডের সঙ্গে যতটা সম্ভব সোজা থাকে।

কাত হয়ে ঘুমালে হাঁটুর মাঝখানে ছোট একটি বালিশ রাখাও শরীরের ভারসাম্য ও মেরুদণ্ডের অবস্থান ঠিক রাখতে সহায়ক হতে পারে।

যারা উপুড় হয়ে ঘুমান

উপুড় হয়ে ঘুমানো মানুষের জন্য বিষয়টি কিছুটা আলাদা। এই অবস্থায় মাথা একদিকে ঘুরিয়ে রাখতে হয়। ফলে ঘাড়ে দীর্ঘ সময় ধরে চাপ পড়তে পারে। বেশি উঁচু বালিশ ব্যবহার করলে মাথা আরও ওপরে উঠে ঘাড়ের বাঁক বাড়তে পারে। তাই উপুড় হয়ে ঘুমানো কেউ কেউ খুব পাতলা বালিশ বা কোনো বালিশ ছাড়াই তুলনামূলক স্বস্তি পান।

তবে এর অর্থ এই নয় যে উপুড় হয়ে ঘুমানোই ভালো। দীর্ঘ সময় এই অবস্থায় থাকলে ঘাড়, কাঁধ ও কোমরে চাপ পড়তে পারে। সম্ভব হলে চিৎ বা কাত হয়ে ঘুমানোর অভ্যাস করা অনেকের জন্য বেশি উপযোগী হতে পারে।

বালিশ ছাড়া ঘুমালে কি ঘাড়ের ব্যথা কমে?

কিছু মানুষের ক্ষেত্রে বালিশ বাদ দিলে আরাম লাগতে পারে, বিশেষ করে যারা উপুড় হয়ে ঘুমান। কিন্তু বালিশ বাদ দিলেই ঘাড়ের ব্যথা ভালো হয়ে যাবে, এমন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। বরং চিৎ বা কাত হয়ে ঘুমানো ব্যক্তির ক্ষেত্রে ভুলভাবে বালিশ বাদ দিলে ঘাড় ও মেরুদণ্ডের স্বাভাবিক অবস্থান নষ্ট হয়ে ব্যথা বা শক্তভাব বাড়তে পারে।

তাই ঘাড়ে ব্যথা থাকলে শুধু বালিশ বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত না নিয়ে ঘুমের ভঙ্গি, বালিশের উচ্চতা এবং গদির ধরনও বিবেচনা করা জরুরি।

গদি কেমন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ

শুধু বালিশের দিকে নজর দিলেই হবে না। গদি নরম না শক্ত, সেটিও মাথা ও ঘাড়ের অবস্থানে প্রভাব ফেলে। নরম গদিতে শরীর বেশি ডুবে গেলে মাথা ও গদির দূরত্ব কমে যেতে পারে। অন্যদিকে শক্ত গদিতে মাথা ও কাঁধের মাঝের ফাঁক তুলনামূলক বেশি থাকতে পারে। ফলে একই বালিশ একজনের জন্য আরামদায়ক হলেও অন্যজনের জন্য উপযুক্ত নাও হতে পারে।

তাহলে বালিশ ব্যবহার করবেন, নাকি করবেন না?

এর সহজ উত্তর হলো, আপনার ঘুমের ভঙ্গির সঙ্গে যে ব্যবস্থা মাথা, ঘাড় ও মেরুদণ্ডকে স্বাভাবিক অবস্থায় রাখে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কেবল প্রচলিত ধারণার কারণে বালিশ বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। আবার বালিশ ব্যবহার করতেই হবে, এমন নিয়মও নেই।

ঘুম থেকে ওঠার পর যদি নিয়মিত ঘাড়ে ব্যথা, কাঁধে অস্বস্তি, মাথাব্যথা বা শরীরে শক্তভাব অনুভূত হয়, তাহলে আপনার বালিশের উচ্চতা ও ঘুমের ভঙ্গি নতুন করে বিবেচনা করা যেতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী বা তীব্র ব্যথা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

সবশেষে বলা যায়, বালিশ ছাড়া ঘুমানো ভালো না খারাপ, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো ঘুমের সময় শরীর সঠিক অবস্থানে আছে কি না। কাত হয়ে বা চিৎ হয়ে ঘুমানো মানুষের জন্য সাধারণত মাথা ও ঘাড়ের যথাযথ সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ। আর উপুড় হয়ে ঘুমানো ব্যক্তির ক্ষেত্রে পাতলা বালিশ বা বালিশ ছাড়া ঘুমানো কখনো বেশি আরামদায়ক হতে পারে। নিজের শরীরের আরাম, ঘুমের মান এবং ঘুম থেকে ওঠার পরের অনুভূতিই হতে পারে সঠিক ব্যবস্থা বেছে নেওয়ার সবচেয়ে বাস্তব নির্দেশক।