মাথাব্যথা হলে অনেকেই সেটিকে সাধারণ ক্লান্তি, ঘুমের অভাব কিংবা অতিরিক্ত কাজের ফল বলে ধরে নেন। কিন্তু মাথাব্যথার সঙ্গে যদি বমি বমি ভাব, আলো বা শব্দে অসহ্য লাগা, মাথার এক পাশে ধুকপুক করা ব্যথা কিংবা চোখের সামনে ঝিলমিল করার মতো উপসর্গ দেখা দেয়, তাহলে সেটি মাইগ্রেনের লক্ষণ হতে পারে। মাইগ্রেন শুধু মাথাব্যথা নয়, এটি স্নায়ুতন্ত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি রোগ। ব্যক্তিভেদে এর লক্ষণ ও তীব্রতাও আলাদা হতে পারে।
তাহলে কীভাবে বুঝবেন, আপনার মাথাব্যথা আসলে মাইগ্রেন কি না? কয়েকটি লক্ষণ খেয়াল করলে বিষয়টি সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পাওয়া যায়।
মাথার এক পাশে ধুকপুক করা ব্যথা
মাইগ্রেনের অন্যতম পরিচিত লক্ষণ হলো মাথায় স্পন্দন বা ধুকপুক ধরনের ব্যথা। অনেকের ক্ষেত্রে ব্যথা মাথার এক পাশে বেশি হয়, যদিও দুই পাশেও হতে পারে। হাঁটা, সিঁড়ি ভাঙা বা অন্য শারীরিক নড়াচড়ায় ব্যথা আরও বেড়ে যেতে পারে। ব্যথা এতটাই তীব্র হতে পারে যে স্বাভাবিক কাজকর্ম করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
আলো ও শব্দ সহ্য না হওয়া
মাইগ্রেনের সময় স্বাভাবিক আলোও অনেকের কাছে অস্বস্তিকর মনে হতে পারে। ঘরের আলো বন্ধ করে অন্ধকারে থাকতে ইচ্ছা করে। একইভাবে টেলিভিশন, মোবাইল, মানুষের কথাবার্তা বা গাড়ির হর্নের মতো স্বাভাবিক শব্দও অসহ্য লাগতে পারে। কারও ক্ষেত্রে তীব্র গন্ধও অস্বস্তি বাড়িয়ে দিতে পারে।
বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া
মাথাব্যথার সঙ্গে যদি বারবার বমি বমি ভাব হয় কিংবা বমি হয়, তাহলে মাইগ্রেনের সম্ভাবনাও বিবেচনায় আসে। অনেকের ক্ষেত্রে বমির পর কিছুটা স্বস্তি মিলতে পারে, তবে সবার অভিজ্ঞতা এক নয়।
চোখের সামনে ঝিলমিল বা জিগজ্যাগ রেখা দেখা
কিছু মানুষের মাইগ্রেন শুরু হওয়ার আগে বা মাথাব্যথার সময় সাময়িক দৃষ্টির পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। চোখের সামনে ঝলমলে আলো, জিগজ্যাগ রেখা, ঝিকমিক করা দাগ বা কোনো অংশে সাময়িকভাবে দেখতে না পাওয়ার মতো ঘটনা ঘটতে পারে। এগুলোকে মাইগ্রেনের ‘অরা’ বলা হয়। সাধারণত অরার লক্ষণ এক ঘণ্টার মধ্যে চলে যায়।
তবে এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার। মাইগ্রেনের অরা সাধারণত দুই চোখের দৃষ্টিক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে। প্রথমবার যদি হঠাৎ এক চোখে দৃষ্টির সমস্যা বা দৃষ্টিশক্তি কমে যায়, সেটিকে নিজে থেকে মাইগ্রেন ধরে নেওয়া উচিত নয়। দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
হাত, মুখ বা শরীরে ঝিনঝিন অনুভূতি
মাইগ্রেনের অরার অংশ হিসেবে কারও কারও হাত, মুখ বা শরীরের এক পাশে ঝিনঝিন বা অবশভাব হতে পারে। এই অনুভূতি ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং পরে চলে যেতে পারে। কিছু মানুষের কথা বলতে বা শব্দ খুঁজে পেতেও সাময়িক অসুবিধা হতে পারে।
মাথাব্যথার আগেই শরীর কিছু সংকেত দিতে পারে
মাইগ্রেনের লক্ষণ সব সময় মাথাব্যথা দিয়ে শুরু হয় না। কারও কারও ক্ষেত্রে এক দিন বা তারও আগে অস্বাভাবিক ক্লান্তি, বারবার হাই তোলা, মেজাজের পরিবর্তন, নির্দিষ্ট খাবারের প্রতি আকর্ষণ, ঘাড় শক্ত লাগা, বেশি তৃষ্ণা বা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি প্রস্রাবের মতো পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। এসব লক্ষণ অনেক সময় মানুষ মাথাব্যথার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে বুঝতে পারেন না।
মাইগ্রেনের পরেও শরীর ক্লান্ত থাকতে পারে
ব্যথা কমে যাওয়ার পরও অনেকের শরীর স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে সময় নেয়। প্রচণ্ড ক্লান্তি, দুর্বলতা বা কিছুটা ঝিমঝিম ভাব থাকতে পারে। কেউ কেউ কিছু সময়ের জন্য মনোযোগ দিতে সমস্যাও অনুভব করেন। মাইগ্রেনের এই পরবর্তী পর্যায়কে ‘পোস্টড্রোম’ বলা হয়।
কতক্ষণ থাকে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ
চিকিৎসা না করলে একটি মাইগ্রেনের আক্রমণ সাধারণত ৪ ঘণ্টা থেকে ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। অবশ্য সবার ক্ষেত্রে সময়কাল এক রকম নয়। কারও আক্রমণ তুলনামূলকভাবে কম সময় স্থায়ী হতে পারে, আবার কারও ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
তবে শুধু লক্ষণ দেখে নিজে নিজে নিশ্চিত হওয়া ঠিক নয়। মাইগ্রেন নির্ণয়ের জন্য সাধারণত রোগীর উপসর্গ, মাথাব্যথার ধরন, আগের ইতিহাস এবং শারীরিক পরীক্ষার তথ্য বিবেচনা করেন চিকিৎসক। মাইগ্রেন শনাক্ত করার জন্য এমন কোনো একক রক্ত পরীক্ষা বা স্ক্যান নেই, যা দিয়ে নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে একজনের মাইগ্রেন আছে। প্রয়োজন হলে অন্য কোনো গুরুতর কারণ বাদ দিতে চিকিৎসক অতিরিক্ত পরীক্ষা দিতে পারেন।
নিজের মাথাব্যথার ধরন বোঝার জন্য একটি ‘হেডেক ডায়েরি’ রাখাও কাজে লাগতে পারে। কখন ব্যথা শুরু হচ্ছে, কতক্ষণ থাকছে, ব্যথার ধরন কেমন, সঙ্গে বমি বা আলো-শব্দে অস্বস্তি হচ্ছে কি না, তার আগে কী খেয়েছেন, ঘুম কেমন হয়েছে এবং কোনো বিশেষ পরিস্থিতির পর ব্যথা শুরু হয়েছে কি না, এসব লিখে রাখলে চিকিৎসকের কাছে সমস্যাটি ব্যাখ্যা করা সহজ হয়।
সব মাথাব্যথা অবশ্য মাইগ্রেন নয়। বিশেষ করে হঠাৎ জীবনের সবচেয়ে তীব্র মাথাব্যথা শুরু হলে, মাথায় আঘাতের পর ব্যথা হলে, জ্বর ও ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়ার সঙ্গে মাথাব্যথা হলে, খিঁচুনি, বিভ্রান্তি, কথা বলতে সমস্যা, শরীরের এক পাশ দুর্বল বা অবশ হয়ে যাওয়া কিংবা হঠাৎ দৃষ্টিশক্তির পরিবর্তন হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি। এসব লক্ষণ অন্য গুরুতর সমস্যার ইঙ্গিতও হতে পারে।
মাইগ্রেনকে চেনার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো নিজের উপসর্গের ধরন ও পুনরাবৃত্তি লক্ষ্য করা। মাথাব্যথা বারবার হলে সেটিকে শুধু সহ্য করে যাওয়ার বদলে কখন, কীভাবে এবং কী কী উপসর্গের সঙ্গে ব্যথা হচ্ছে, তা খেয়াল করুন। এতে যেমন নিজের সমস্যা বোঝা সহজ হবে, তেমনি প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের কাছেও সঠিক তথ্য দেওয়া সম্ভব হবে।
.jpg)