পিত্তথলি শরীরের ছোট একটি অঙ্গ, কিন্তু হজমের প্রক্রিয়ায় এর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। যকৃত থেকে তৈরি হওয়া পিত্তরস পিত্তথলিতে জমা থাকে এবং খাবার খাওয়ার পর প্রয়োজন অনুযায়ী ক্ষুদ্রান্ত্রে গিয়ে চর্বি হজমে সাহায্য করে। এই পিত্তরসের উপাদানগুলোর ভারসাম্য নষ্ট হলে ধীরে ধীরে সেখানে ছোট ছোট কণা তৈরি হতে পারে। সময়ের সঙ্গে সেই কণাগুলো শক্ত হয়ে পাথরে পরিণত হয়। এই পাথরকেই বলা হয় গলস্টোন বা পিত্তথলির পাথর।
পিত্তথলির পাথর সবার ক্ষেত্রে একই রকম হয় না। কারও একটি বড় পাথর হতে পারে, আবার কারও পিত্তথলিতে শত শত ছোট পাথরও থাকতে পারে। পাথরের আকার বালির দানার মতো ছোট থেকে শুরু করে কয়েক সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে।
পিত্তরসে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল জমলে
পিত্তথলির পাথরের সবচেয়ে পরিচিত ধরন হলো কোলেস্টেরল পাথর। সাধারণ অবস্থায় পিত্তরসে এমন কিছু উপাদান থাকে, যা কোলেস্টেরলকে দ্রবীভূত অবস্থায় রাখতে সাহায্য করে। কিন্তু যকৃত থেকে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল পিত্তে চলে এলে সেই ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। অতিরিক্ত কোলেস্টেরল ছোট ছোট স্ফটিক বা ক্রিস্টালে পরিণত হয়। পরে এসব ক্রিস্টাল একত্র হয়ে ধীরে ধীরে পাথর তৈরি করতে পারে।
বিলিরুবিনের পরিমাণ বেড়ে গেলেও পাথর হতে পারে
পিত্তরসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো বিলিরুবিন। শরীরে লোহিত রক্তকণিকা ভাঙার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় বিলিরুবিন তৈরি হয়। কিছু রোগ বা অবস্থায় শরীরে বিলিরুবিনের পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে। তখন বিলিরুবিন-সমৃদ্ধ পিগমেন্ট পাথর তৈরি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। লিভারের কিছু রোগ, পিত্তনালির সংক্রমণ এবং কিছু রক্তের রোগের সঙ্গে এ ধরনের পাথরের সম্পর্ক রয়েছে।
পিত্তথলি ঠিকমতো খালি না হলেও সমস্যা হতে পারে
পিত্তথলিতে শুধু পিত্তরস জমা থাকলেই পাথর হয় না। পিত্তথলি নিয়মিত ও সম্পূর্ণভাবে খালি না হলে পিত্তরস বেশি ঘন হয়ে যেতে পারে। এই ঘন পিত্তে ক্রিস্টাল তৈরি হওয়ার পরিবেশ তৈরি হয় এবং ধীরে ধীরে সেগুলো পাথরে পরিণত হতে পারে।
অতিরিক্ত ওজন একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি
অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা পিত্তথলিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বিশেষ করে শরীরে অতিরিক্ত চর্বি থাকলে পিত্তে কোলেস্টেরলের পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে। ফলে কোলেস্টেরল পাথর তৈরির সম্ভাবনাও বাড়ে।
হঠাৎ ওজন কমানোর চেষ্টাও বিপদ ডেকে আনতে পারে
ওজন কমানোর জন্য দ্রুত খাবার কমিয়ে দেওয়া বা খুব অল্প ক্যালরির ডায়েট অনুসরণ করাও পিত্তথলির পাথরের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। দ্রুত ওজন কমলে পিত্তে কোলেস্টেরলের ভারসাম্য পরিবর্তিত হতে পারে এবং পিত্তথলির স্বাভাবিক সংকোচনও প্রভাবিত হতে পারে। তাই ওজন কমাতে হলে ধীরে ও নিরাপদভাবে কমানো গুরুত্বপূর্ণ।
খাবারের ধরনও ভূমিকা রাখে
খাবারকে একমাত্র কারণ হিসেবে দায়ী করা ঠিক নয়। তবে উচ্চ ক্যালরি, অতিরিক্ত পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট ও কম আঁশযুক্ত খাদ্যাভ্যাস পিত্তথলিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। অন্যদিকে ফল, সবজি, ডাল ও পূর্ণ শস্যের মতো আঁশসমৃদ্ধ খাবার এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে।
নারীদের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি
নারীদের মধ্যে পিত্তথলির পাথর তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। এর একটি কারণ হিসেবে ইস্ট্রোজেনের ভূমিকা বিবেচনা করা হয়। গর্ভাবস্থা, ইস্ট্রোজেনযুক্ত হরমোন থেরাপি এবং কিছু জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির কারণে শরীরে ইস্ট্রোজেনের মাত্রা বাড়লে পিত্তে কোলেস্টেরলের পরিমাণ ও পিত্তথলির সংকোচনে পরিবর্তন ঘটতে পারে।
বয়স বাড়লেও ঝুঁকি বাড়ে
বয়স বাড়ার সঙ্গে পিত্তথলিতে পাথর হওয়ার সম্ভাবনাও বাড়তে পারে। পারিবারিক ইতিহাস থাকলেও ঝুঁকি বেশি হতে পারে। অর্থাৎ একই পরিবারের একাধিক সদস্যের পিত্তথলিতে পাথর হওয়ার ঘটনা থাকলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।
ডায়াবেটিসসহ কিছু রোগেও ঝুঁকি বাড়তে পারে
ডায়াবেটিস ও ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স, উচ্চ ট্রাইগ্লিসারাইড, কিছু লিভারের রোগ, অন্ত্রের কিছু রোগ এবং কিছু ধরনের রক্তের রোগ পিত্তথলিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে এসব ঝুঁকি থাকলেই যে পাথর হবেই, এমন নয়।
পাথর থাকলেই যে ব্যথা হবে, তা নয়
পিত্তথলিতে পাথর থাকা মানেই সবসময় কোনো উপসর্গ দেখা দেবে, এমন নয়। অনেকের পিত্তথলিতে পাথর থাকলেও তারা বছরের পর বছর কোনো সমস্যা টের পান না। এ ধরনের পাথরকে অনেক সময় ‘সাইলেন্ট গলস্টোন’ বলা হয়। পাথর পিত্তনালি আটকে দিলে সাধারণত সমস্যা শুরু হয়।
পাথর পিত্তনালি আটকে দিলে হঠাৎ পেটের ওপরের ডান দিকে তীব্র ব্যথা হতে পারে। কখনো পেটের মাঝখানেও ব্যথা অনুভূত হতে পারে এবং ব্যথা পিঠ বা ডান কাঁধের দিকে ছড়িয়ে যেতে পারে। সঙ্গে বমি বমি ভাব বা বমিও হতে পারে। এ ধরনের ব্যথা কয়েক মিনিট থেকে কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
তবে ব্যথার সঙ্গে জ্বর বা কাঁপুনি, চোখ ও ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়া, দীর্ঘ সময় ধরে তীব্র পেটব্যথা, গাঢ় রঙের প্রস্রাব বা ফ্যাকাশে পায়খানা হলে বিষয়টি অবহেলা করা ঠিক নয়। পিত্তনালি বা পিত্তথলিতে গুরুতর প্রদাহ বা সংক্রমণের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। এসব ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন।
পিত্তথলির পাথর শনাক্ত করতে চিকিৎসক সাধারণত রোগীর উপসর্গ ও শারীরিক পরীক্ষা বিবেচনা করেন। প্রয়োজন হলে রক্ত পরীক্ষা এবং বিভিন্ন ধরনের ইমেজিং পরীক্ষা করা হয়।
পিত্তথলিতে পাথর হওয়ার সব কারণ নিজের হাতে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। বয়স, পারিবারিক ইতিহাস বা কিছু শারীরিক অবস্থার মতো বিষয় এড়ানো যায় না। তবে স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা, খুব দ্রুত ওজন কমানোর চেষ্টা না করা, নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তা বজায় রাখা এবং আঁশসমৃদ্ধ সুষম খাবার খাওয়ার অভ্যাস ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পিত্তথলিতে পাথর আছে কি না তা শুধু পেটব্যথার ধরন দেখে নিশ্চিত হওয়া যায় না। একই ধরনের ব্যথা অন্য অনেক রোগেও হতে পারে। তাই বারবার বা তীব্র পেটব্যথা হলে কারণ খুঁজে বের করতে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
.jpg)